ওয়ার্ড কাউন্সিলর থেকে মন্ত্রী হলেন আরিফুল হক চৌধুরী

সিলেটের রাজনীতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং উন্নয়নমুখী জননেতা আরিফুল হক চৌধুরী তাঁর দীর্ঘ ২৩ বছরের রাজনৈতিক পরিক্রমায় এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছেন। ২০০৩ সালে সিলেট সিটি করপোরেশনের একটি সাধারণ ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হিসেবে যাত্রা শুরু করে ২০২৬ সালে তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন। তাঁর এই উত্তরণ কেবল তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং তৃণমূল থেকে উঠে আসা একজন রাজনীতিবিদের জন্য এক বিরল দৃষ্টান্ত।

নির্বাচনী ফলাফল ও রাজকীয় বিজয়

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৪ (জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জ) আসন থেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির প্রার্থী হিসেবে লড়েন আরিফুল হক চৌধুরী। ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে তিনি এক অবিশ্বাস্য জয় ছিনিয়ে আনেন। নির্বাচনের প্রাপ্ত ভোটের ব্যবধান বিশ্লেষণ করলে তাঁর জনপ্রিয়তার এক স্পষ্ট চিত্র ফুটে ওঠে।

একনজরে সিলেট-৪ আসনের নির্বাচনী ফলাফল:

প্রার্থীর নামরাজনৈতিক দলপ্রতীকপ্রাপ্ত ভোট
আরিফুল হক চৌধুরীবিএনপিধানের শীষ১,৮৮,৩৪৬
মো. জয়নাল আবেদীনজামায়াতে ইসলামীদাঁড়িপাল্লা৬৯,৯৭৫
ভোটের ব্যবধান১,১৮,৩৭১

এই ভূমিধস বিজয়ের পর রাষ্ট্রপতি তাঁকে সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ প্রদান করেছেন। সিলেট অঞ্চলের মানুষের প্রবাসমুখী প্রবণতা এবং রেমিট্যান্সের অবদানের কথা বিবেচনায় রেখে তাঁর এই মন্ত্রণালয় প্রাপ্তি অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে।


রাজনৈতিক জীবন ও বর্ণাঢ্য কর্মজীবন

আরিফুল হক চৌধুরী ১৯৫৯ সালের ২৩ নভেম্বর সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। ১৯৭৯ সালে ছাত্রদল প্রতিষ্ঠার শুরুতেই তিনি এর সক্রিয় সদস্য হিসেবে কাজ শুরু করেন এবং পরবর্তীতে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও সিলেট জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

তাঁর রাজনৈতিক জীবনের মূল বাঁক শুরু হয় ২০০৩ সালে সিলেট সিটি করপোরেশনের ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে। এরপর তিনি তৎকালীন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের অত্যন্ত আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন এবং সিলেটের নগর উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

আরিফুল হক চৌধুরীর রাজনৈতিক মাইলফলক:

  • ২০০৩: সিসিকের ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়া।

  • ২০১৩: সিলেটের জনপ্রিয় নেতা বদরউদ্দিন আহমদ কামরানকে পরাজিত করে প্রথমবার মেয়র নির্বাচিত হওয়া।

  • ২০১৮: টানা দ্বিতীয় মেয়াদে সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হওয়া।

  • ২০২৩: দলীয় সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান জানিয়ে মেয়র নির্বাচন থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখা।

  • ২০২৬: সিলেট-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবং প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ।


প্রতিকূলতা কাটিয়ে সফলতার শীর্ষে

আরিফুল হক চৌধুরীর পথচলা সবসময় মসৃণ ছিল না। ২০০৭ সালের ‘ওয়ান-ইলেভেন’ পরবর্তী প্রেক্ষাপটে তাঁকে দীর্ঘ সময় কারাবরণ করতে হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েও তিনি তাঁর নীতি ও আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনে তিনি সিলেট-১ আসন থেকে মনোনয়ন চেয়েছিলেন, কিন্তু দলের কৌশলগত প্রয়োজনে তাঁকে শেষ মুহূর্তে সিলেট-৪ আসনে পাঠানো হয়। মাত্র কয়েক দিনের প্রচারণায় তিনি যেভাবে জয়ী হয়েছেন, তা সিলেটের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অবাক করেছে।

শপথ গ্রহণের পর এক প্রতিক্রিয়ায় আরিফুল হক চৌধুরী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও বিএনপির সকল স্তরের নেতাকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “ওয়ার্ড কাউন্সিলর থেকে আজ আপনারা আমাকে যে উচ্চতায় বসিয়েছেন, তার ঋণ আমি কাজের মাধ্যমে শোধ করতে চাই।” প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের অধিকার রক্ষা এবং সিলেটের উন্নয়নে নিজেকে উৎসর্গ করার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।