বাংলাদেশের রক সঙ্গীতের অগ্রদূত ওয়ারফেজ ইতিহাস গড়লো দেশের সর্বোচ্চ সাংস্কৃতিক সম্মান, একুশে পদক ২০২৬-এর জন্য মনোনীত প্রথম ব্যান্ড হিসেবে। চার দশকের অবিস্মরণীয় সঙ্গীত ও সাংস্কৃতিক অবদানের স্বীকৃতিতে এই পদক প্রদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ওয়ারফেজের পাশাপাশি এই বছরের একুশে পদক পাবেন দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের জন্য নির্বাচিত নয়জন বিশিষ্ট ব্যক্তি। পদক প্রাপ্তির অনুষ্ঠান এই মাসের শেষের দিকে অনুষ্ঠিত হবে।
পুনর্মিলনী উৎসব
ঘোষণার পর ওয়ারফেজ আয়োজন করল একটি বড় পুনর্মিলনী, যেখানে সারা পৃথিবী থেকে প্রাক্তন ও বর্তমান সদস্যরা মিলিত হলেন। কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মতো দেশ থেকে সদস্যরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য ছিল পদক গ্রহণের অভিজ্ঞতাকে স্মরণীয় করে তোলা।
প্রতিষ্ঠাতা ও গিটারিস্ট ইব্রাহিম আহমেদ কামাল বলেন, “ওয়ারফেজ শুধু একটি ব্যান্ড নয়; এটি একটি পরিবার। পদক ঘোষণার পর আমরা ঠিক করেছিলাম একসাথে তা গ্রহণ করব। সব কিছু এত দ্রুত ও সুন্দরভাবে ঘটল যে মনে হচ্ছে এটি একটি স্বপ্ন।”
সহপ্রতিষ্ঠাতা, ব্যান্ডলিডার ও ড্রামার শেখ মনিরুল আলম যোগ করেন, “আমাদের মূল লাইন-আপের মধ্যে শুধু রাসেল আলি যোগ দিতে পারেননি। যারা আসতে পারেননি, তাদের জন্য এটি দুঃখজনক। সবাইকে একসাথে পেলে উদযাপনটি আরও আনন্দময় হত।”
পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান
উৎসবটি শুক্রবার, ঢাকার বনানীতে অনুষ্ঠিত হয়। দেশ-বিদেশ থেকে আসা সদস্য এবং তাদের পরিবার অনুষ্ঠানটিকে একটি উষ্ণ, পারিবারিক পরিবেশে পরিপূর্ণ করেন। ইফতার ও রাতের ভোজের ব্যবস্থা ছিল। শিল্প জগতের বন্ধুদের উপস্থিতি উদযাপনকে আরও প্রাণবন্ত করেছে। ব্যান্ডের প্রাথমিক দিনের গল্প এবং পুরনো স্মৃতিগুলো ভাগ করে নেওয়া হয়, যা উপস্থিত সবাইকে অতীতের নস্টালজিয়ায় ভাসিয়ে দেয়। শেখ মনিরুল আলম বলেন, “এটি পুরোপুরি একটি পরিবারের মিলনের মতো লাগল। সবাই গভীরভাবে স্মৃতিমগ্ন ছিল; এটি একটি অত্যন্ত আনন্দময় অনুষ্ঠান।”
ওয়ারফেজের সঙ্গীত যাত্রা
ওয়ারফেজ ১৯৮৪ সালে ঢাকা শহরে পাঁচজন স্কুলছাত্র—কামাল (বেস), মীর (গিটার), নাইমুল (গিটার), হেলাল (ড্রামস), এবং বাপ্পি (ভোকাল)—দ্বারা গঠিত হয়। তখন থেকে তাদের যাত্রা লেজেন্ডারি হয়ে উঠেছে, দেশের রক সঙ্গীত দৃশ্যকে নতুন রূপ দিয়েছে এবং প্রজন্মের সঙ্গীতশিল্পীদের অনুপ্রাণিত করেছে।
| বছর | প্রধান ঘটনা |
|---|---|
| ১৯৮৪ | ওয়ারফেজ গঠন; প্রথম অ্যালবাম প্রকাশ |
| ১৯৮৫–১৯৯০ | প্রাথমিক রেকর্ডিং ও লাইভ পারফরম্যান্স |
| ১৯৯০–২০০০ | জাতীয় পর্যায়ে খ্যাতি অর্জন; লাইভ শোতে সাফল্য |
| ২০০০–২০১০ | নতুন সদস্য সংযোজন, রেকর্ডিং প্রজেক্ট, আন্তর্জাতিক ট্যুর |
| ২০১০–২০২০ | ভক্তদের বিস্তার; আধুনিক রক স্টাইলের বিকাশ |
| ২০২৬ | প্রথম রক ব্যান্ড হিসেবে একুশে পদক অর্জন |
কামাল স্মৃতিচারণ করে বলেন, “সেন্ট জোসেফ স্কুলে আমরা একত্রে অর্থসংগ্রহ করে যন্ত্র কিনেছিলাম এবং ওয়ারফেজ গঠন করি। ৬ জুন ১৯৮৪-এ ৮৯ লেকস সার্কাস, কলাবাগানে আমাদের প্রথম পারফরম্যান্স হয়েছিল। পদকের খবর শুনে সেই দিনটি যেন ফিরে এলো।”
শেখ মনিরুল আলম বলেন, “চার দশক পার হয়ে গেছে। এই অর্জন শুধুমাত্র ওয়ারফেজের নয়, বরং বাংলাদেশের সকল রক সঙ্গীতপ্রেমীর।”
চার দশকের সঙ্গীত যাত্রা, নতুন প্রজন্মকে প্রভাবিত করা, এবং দেশের রক সঙ্গীতের উত্তরাধিকার রচনার কারণে ওয়ারফেজ এখন দেশের সর্বোচ্চ সাংস্কৃতিক সম্মান, একুশে পদক, অর্জন করেছে।
