একতরফা তালাক নারীদের বিপর্যয়, সুরক্ষা দরকার

বাংলাদেশে মুসলিম ব্যক্তি আইন অনুযায়ী ইচ্ছা করলে জবাবদিহি ছাড়া স্ত্রীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ করতে পারেন, যা সাধারণত ‘তালাক’ নামে পরিচিত। তবে তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট বিধি অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর ধারা ৭ অনুযায়ী, তালাকের জন্য নিবন্ধন করা এবং স্থানীয় চেয়ারম্যানকে নোটিশ পাঠানো অপরিহার্য। চেয়ারম্যান চাইলে উভয় পক্ষকে সমঝোতা বৈঠকে ডাকার পরামর্শ দিতে পারেন। কিন্তু বৈঠক আয়োজন না হলে, নোটিশ প্রাপ্তির তিন মাসের মধ্যে তালাক আইনত কার্যকর হয়।

মুসলিম নারীদের সরাসরি তালাকের অধিকার নেই। তারা কেবল স্বামীর অনুমতি অথবা আদালতের মাধ্যমে (মুসলিম বিবাহবিচ্ছেদ আইন ১৯৩৯ অনুযায়ী) বিবাহবিচ্ছেদ চাইতে পারেন। যদিও আধুনিক বিয়ের কাবিননামায় প্রায়ই স্বামীকে একতরফা তালাক দেওয়ার ক্ষমতা প্রদান করা হয়, ফলে নারীরাও বাস্তবে চাইলে স্বামীর কাছ থেকে বিচ্ছেদ নিতে পারেন। তবে এই একতরফা প্রক্রিয়া সমাজে নারীর জন্য অসীম ভোগান্তি ও আর্থিক-মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে।

নিচের উদাহরণগুলো নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক দুরবস্থার চিত্র তুলে ধরছে:

নাম (ছদ্মনাম)বয়সবিবাহকালসমস্যাবর্তমান অবস্থা
লতিফা বেগম৫৫৩০ বছরস্বামীর শারীরিক নির্যাতনলিগ্যাল এইড অফিসে সমাধানের আশায়
কুলসুম আক্তার৩৮১৮ বছরস্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে, সম্পত্তি হারানোবাবার বাড়িতে অসহায়, আদালতে প্রতিকার চাইছে
নাইমা রহমান২৫২ বছরস্বামীর হঠাৎ তালাকআদালতে দ্বারে দ্বারে ঘুরছে, মানসিক চাপ
সুফিয়া৩২১২ বছরস্বামীর পরকীয়া, সন্তানদের দায়িত্বনিজের শ্রম ও সংসার হারিয়ে, সন্তানসহ প্রতিকার আশায়

এই উদাহরণগুলো দেখাচ্ছে, নারীরা মোহরানা, ভরণপোষণ, সন্তানদের নিরাপত্তা ও যৌথ সম্পত্তিতে অধিকার না থাকার কারণে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ও মানসিক ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছেন।

বিশ্বের অন্যান্য দেশে তালাকের ক্ষেত্রে পারিবারিক, আর্থিক ও সামাজিক বিষয়গুলোর সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ইন্দোনেশিয়ার ‘The Family Law of the Republic of Indonesia’ অনুযায়ী:

  • একাধিক স্ত্রী গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীর অধিকার ও মৌলিক চাহিদা পূরণ বাধ্যতামূলক।

  • বিবাহকালীন অর্জিত সম্পত্তি স্বামী–স্ত্রীর যৌথ।

  • আদালত চাইলে তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীর জন্য ভরণপোষণ এবং সন্তানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেন।

বাংলাদেশেও পারিবারিক আদালত পুনর্গঠিত হয়েছে এবং প্রতিটি জেলায় পারিবারিক আদালত ও পারিবারিক আপিল আদালত প্রতিষ্ঠিত। তবু, একতরফা তালাক প্রথা নারীদের বিপর্যয় ডেকে আনছে। মোহরানা, সন্তানদের অভিভাবকত্ব, ভরণপোষণ, ক্ষতিপূরণ এবং যৌথ সম্পত্তির বিষয়গুলো তালাকের আগে আইনত বাধ্যতামূলক করা গেলে পারিবারিক বিরোধ কমানো সম্ভব।

নারী–শিশুদের মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত করতে আমাদের আইনি ব্যবস্থা সমানাধিকার, প্রতিকার এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দিকে মনোযোগী হতে হবে। না হলে সমাজে নারীর দুর্দশা অব্যাহত থাকবে। সময় এসেছে আমাদের আইনি কাঠামোকে দায়িত্বশীল ও মানবিক সমাধানমুখী করার।