বিশ্ব অর্থনীতি দ্রুত এগোচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)–নির্ভর এক নতুন পর্যায়ে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এআইয়ের অবদান ১৫ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি হতে পারে। এই রূপান্তরের অভিঘাত সবচেয়ে তীব্র হবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর—কারণ প্রযুক্তি গ্রহণে সামান্য বিলম্বও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বড় ব্যবধান তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশের জন্য তাই এআই আর ভবিষ্যতের কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়; এটি এখনই অর্থনীতি, সেবা ও শাসনব্যবস্থাকে রূপান্তরের প্রশ্ন।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামো মূলত শ্রমঘন খাতনির্ভর। এই কাঠামোয় উৎপাদনশীলতা তুলনামূলক কম, অথচ জনসংখ্যা ও সেবার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। এআই এখানে দ্বিমুখী সুফল দিতে পারে—একদিকে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, অন্যদিকে সীমিত সম্পদ দিয়ে আরও বেশি ও উন্নত সেবা প্রদান। সরকারি সেবায় এআই প্রয়োগে সময় ও ব্যয় ২০–৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব বলে বিভিন্ন পরীক্ষামূলক প্রয়োগে দেখা গেছে। কৃষিতে ফলন পূর্বাভাস ও রোগ শনাক্তকরণে ক্ষতি ১০–১৫ শতাংশ কমতে পারে, আর ব্যাংকিং খাতে জালিয়াতি শনাক্তকরণে দক্ষতা বাড়তে পারে ৩০–৪০ শতাংশ পর্যন্ত। তবে এসব সুফল পেতে হলে এআই কেবল আমদানি করলেই হবে না; দেশীয় বাস্তবতায় মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।
এখানেই আসে ডেটার প্রশ্ন। বাংলাদেশে ডেটার পরিমাণ বিশাল—১৮ কোটির বেশি জাতীয় পরিচয়পত্র রেকর্ড, ১৭ কোটির বেশি মোবাইল সংযোগ, ৭ কোটির বেশি মোবাইল আর্থিক সেবা ব্যবহারকারী, সঙ্গে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষার বিপুল তথ্যভাণ্ডার। কিন্তু এই ডেটা এআইয়ের জন্য প্রস্তুত নয়। সমস্যাটি তিন স্তরে স্পষ্ট। প্রথমত, বিচ্ছিন্নতা—সরকারি ডেটার বড় অংশ এখনো সাইলোভিত্তিক; এক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অন্য মন্ত্রণালয়ের কাজে আসে না। গবেষণায় দেখা যায়, সরকারি ডেটার প্রায় ৬০–৭০ শতাংশ আন্তসংযুক্ত নয়। দ্বিতীয়ত, মান ও হালনাগাদের ঘাটতি—অনেক ডেটাসেট নিয়মিত আপডেট না হওয়ায় এআই মডেলের পূর্বাভাস বাস্তবতার সঙ্গে মিলছে না। তৃতীয়ত, ডেটা গভর্ন্যান্স—ডেটা ব্যবহারের সুস্পষ্ট আইনি ও নৈতিক কাঠামো না থাকলে এআই প্রয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এআইয়ের আরেকটি বড় ভিত্তি হলো ক্লাউড ও কম্পিউটিং অবকাঠামো। একটি মাঝারি মানের এআই মডেল প্রশিক্ষণে প্রয়োজন উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জিপিইউ, দীর্ঘ সময়ের বিদ্যুৎ ও কুলিং সুবিধা এবং স্কেলযোগ্য ক্লাউড। বাংলাদেশে জাতীয় ডেটা সেন্টার ও কিছু বেসরকারি উদ্যোগ থাকলেও এআই-মানের জিপিইউ অবকাঠামো সীমিত। ফলে বড় প্রকল্পে বিদেশি ক্লাউডের ওপর নির্ভরতা প্রায় ৭০ শতাংশ, দেশীয় অবকাঠামো ৩০ শতাংশের কাছাকাছি। এতে খরচ বাড়ে, পাশাপাশি ডেটার সার্বভৌমত্ব নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
মানবসম্পদের ক্ষেত্রেও বৈপরীত্য স্পষ্ট। প্রতিবছর ২০–২৫ হাজার তথ্যপ্রযুক্তি স্নাতক পাস করলেও বাস্তব সমস্যাভিত্তিক দক্ষ এআই প্রকৌশলীর সংখ্যা খুবই কম। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রয়োজনের তুলনায় দক্ষ এআই জনবল বর্তমানে ৪–৫ গুণ কম। উন্নত গবেষণা সক্ষমতা ও শিল্প–বিশ্ববিদ্যালয় সহযোগিতা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে।
নীতিনির্ধারণে ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। ইউরোপে ঝুঁকিভিত্তিক এআই আইন, যুক্তরাষ্ট্রে খাতভিত্তিক গাইডলাইন এবং এশিয়ার বহু দেশে জাতীয় এআই কৌশল প্রণীত হলেও বাংলাদেশে এখনো পূর্ণাঙ্গ এআই নীতিমালা নেই। ডেটা সুরক্ষা আইন বাস্তব প্রয়োগের অপেক্ষায়, সরকারি ব্যবহারে এআইয়ের নৈতিক নির্দেশনা অস্পষ্ট। নীতি ছাড়া এআই মানে নিয়ন্ত্রণহীন প্রযুক্তি—যার খেসারত শেষ পর্যন্ত নাগরিককেই দিতে হয়।
তবু আশার জায়গা আছে। কৃষি, স্বাস্থ্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও পরিবহন—এই খাতগুলোতে দ্রুত সুফল পাওয়া সম্ভব। কৃষিতে ক্ষতি ১০–১৫ শতাংশ কমানো, স্বাস্থ্যখাতে প্রাথমিক স্ক্রিনিং দক্ষতা ২৫–৩০ শতাংশ বাড়ানো, দুর্যোগে পূর্বাভাসের সময় বাড়ানো এবং যানজটে সময় ১৫–২০ শতাংশ কমানো বাস্তবসম্মত লক্ষ্য।
নিচের টেবিলটি বাংলাদেশের এআই প্রস্তুতির একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরে—
| ক্ষেত্র | বর্তমান অবস্থা | প্রধান ঘাটতি |
|---|---|---|
| ডেটা | বিপুল পরিমাণ | আন্তসংযোগ ও মান |
| কম্পিউটিং | সীমিত জিপিইউ | উচ্চ খরচ |
| ক্লাউড | বিদেশিনির্ভর | সার্বভৌমত্ব ঝুঁকি |
| মানবসম্পদ | সংখ্যায় বেশি | দক্ষতার ঘাটতি |
| নীতি | আংশিক | পূর্ণাঙ্গ কাঠামো নেই |
সংখ্যাই এখানে সবচেয়ে স্পষ্ট ভাষ্য দেয়। ডেটা আছে, কিন্তু প্রস্তুত নয়; আগ্রহ আছে, কিন্তু অবকাঠামো সীমিত; জনবল আছে, কিন্তু দক্ষতা অসম্পূর্ণ। বাংলাদেশের সামনে এখনো সুযোগের জানালা খোলা—তবে তা চিরস্থায়ী নয়। এআইয়ের পথে হাঁটা শুরু হয়েছে; এখন প্রয়োজন কৌশল, সংখ্যা ও বাস্তব হিসাবকে সামনে রেখে দৃঢ় পদক্ষেপ।
ড. তৌহিদ ভূঁইয়া
তথ্যপ্রযুক্তিবিদ ও অধ্যাপক, ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি
