দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ঋণ ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর ও সুসংগঠিত করা এবং করের আওতা ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি মনে করেন, টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে এই দুটি খাতেই এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া অপরিহার্য।
রোববার (৫ এপ্রিল) রাজধানীর পরিকল্পনা কমিশন-এর এনইসি সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত ‘ন্যাশনাল মাল্টিস্টেকহোল্ডার কনসালটেশন অন বাংলাদেশ গ্র্যাজুয়েশন রেডিনেস অ্যাসেসমেন্ট’ শীর্ষক সেমিনারের সমাপনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন রাবাব ফাতিমা এবং জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকিসহ বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা।
বাণিজ্যমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে একটি জটিল অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং বৈদেশিক ঋণের চাপ—সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে একটি বহুমাত্রিক চাপ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সুপরিকল্পিত ও বাস্তবভিত্তিক নীতিমালা গ্রহণের বিকল্প নেই।
তিনি উল্লেখ করেন, অতীতে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও কার্যকর যাচাই-বাছাই ছাড়া কিছু বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল, যার ফলে দেশের ঋণের বোঝা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি, বাস্তবায়নে বিলম্ব এবং প্রত্যাশিত সুফল অর্জনে ব্যর্থতার কারণে অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে বিদ্যমান ঋণ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যতে নতুন প্রকল্প গ্রহণে অধিক সতর্কতা অবলম্বন করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
ঋণ ব্যবস্থাপনা জোরদারের প্রধান দিকসমূহ
| বিষয় | প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ |
|---|---|
| প্রকল্প নির্বাচন | অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক ও বাস্তবসম্মত প্রকল্প নির্ধারণ |
| ব্যয় নিয়ন্ত্রণ | বাজেটের মধ্যে ব্যয় সীমিত রাখা |
| সময়ানুবর্তিতা | নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প সম্পন্ন নিশ্চিত করা |
| ঋণ ব্যবস্থাপনা | স্বল্প সুদের উৎস থেকে ঋণ গ্রহণ ও ঝুঁকি বিশ্লেষণ |
| জবাবদিহিতা | প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও কঠোর তদারকি |
কর ব্যবস্থার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, দেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনো সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছায়নি। এ অবস্থায় করের হার বাড়ানোর পরিবর্তে করের আওতা বৃদ্ধি করাই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধান। তিনি আরও বলেন, দেশের একটি বড় অংশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এখনো আনুষ্ঠানিক কর কাঠামোর বাইরে রয়ে গেছে, যা রাজস্ব আহরণে বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।
কর ব্যবস্থার উন্নয়নে করণীয় উদ্যোগ
| খাত | করণীয় |
|---|---|
| করের আওতা বৃদ্ধি | নতুন করদাতা শনাক্ত ও নিবন্ধন বৃদ্ধি |
| ডিজিটাল করব্যবস্থা | অনলাইন প্ল্যাটফর্ম সম্প্রসারণ |
| স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা | কর প্রশাসনে সুশাসন নিশ্চিত |
| সচেতনতা বৃদ্ধি | নাগরিকদের কর প্রদানে উৎসাহিত করা |
| ফাঁকি প্রতিরোধ | নজরদারি জোরদার ও আইন প্রয়োগ |
তিনি আরও বলেন, অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়ানো গেলে বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে। এতে দেশের ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং উন্নয়ন কার্যক্রম আরও টেকসই ও ভারসাম্যপূর্ণভাবে এগিয়ে নেওয়া যাবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নয়নোত্তর ধাপে উত্তরণের জন্য শক্তিশালী রাজস্ব কাঠামো, কার্যকর ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং সুশাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে সরকারের সমন্বিত উদ্যোগই হতে পারে ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার মূল চাবিকাঠি।
সবশেষে বাণিজ্যমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। তাই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, দক্ষ বাস্তবায়ন এবং জবাবদিহিতার মাধ্যমে একটি স্থিতিশীল ও টেকসই অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
