উৎপল শুভ্রর লেখা,বিসিবিতে ক্রমবর্ধমান নাটকীয়তা ও ‘সার্কাস’ চলিতেছে

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে (বিসিবি) যা ঘটছে, তা যেন আরেকটি রেকর্ডের জন্ম দিচ্ছে। গিনেস বুক অব রেকর্ডসে নাম ওঠাতে তথ্যপ্রমাণের প্রয়োজন, কিন্তু বাংলাদেশের ক্রিকেট প্রশাসনের সাম্প্রতিক ঘটনায় এই রেকর্ড ইতিমধ্যেই স্থাপিত হয়েছে। প্রশ্ন একটাই—বিসিবি সভাপতির চেয়ারে একদিনে দুই জন বসার নজির বিশ্ব ক্রিকেটে কোথাও আছে কি না। ৭ এপ্রিল, দুপুরে আমিনুল ইসলাম চেয়ারটি গ্রহণ করেন, আর সন্ধ্যার আগেই একই চেয়ারে বসেছিলেন তামিম ইকবাল। যদিও বোর্ড সভাপতি কোনো স্থায়ী পদ নয়, তবে একই দিনে এই দ্রুত পরিবর্তন নিশ্চিতভাবে অদ্বিতীয়।

বাংলাদেশের ক্রিকেটে এমন অদ্ভুত নজির নিয়মিতই চোখে পড়ে। জাতীয় দলের তিন সাবেক অধিনায়ক পরপর বোর্ড সভাপতি হয়েছেন—বিশ্বের অন্য কোনো দেশে এমন নজির বিরল। খেলোয়াড়দের মধ্যে একটি সাধারণ অনুভূতি থাকে—ক্রিকেট যা দিয়েছে, তার কিছুটা ফিরিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা। তবে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের মধ্যে এই ব্যাকুলতা যেন অন্যরকম মাত্রা পেয়ে যায়।

গত পরশু বিকেলে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ নির্বাচিত বিসিবি কমিটি ভেঙে দিয়ে অ্যাডহক কমিটি গঠনের ঘোষণা দিলে তামিম ইকবাল সরকারি প্রজ্ঞাপনের অপেক্ষা না করে সোজা সভাপতির চেয়ারে বসেন। মুহূর্তেই উপস্থিত হন কমিটির অন্যান্য সদস্যরাও, এবং একটি ছোট সভা সম্পন্ন হয়।

আমিনুল ইসলাম, যিনি এখনও নিজেকে বৈধ সভাপতি দাবি করছেন, স্বীকার করেছেন যে তাঁর কার্যকাল ‘টি-টুয়েন্টি ইনিংস’-এর মতো সংক্ষিপ্ত। ফারুক আহমেদও জুলাই ২০২৪-এর অভ্যুত্থানের পর অপ্রত্যাশিতভাবে সভাপতি হন এবং পরে প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে সহসভাপতি হিসেবে ফিরেছেন।

সাম্প্রতিক বছরের বিসিবি সভাপতির অবস্থান পরিবর্তনের তালিকা টেবিলে দেওয়া হলো:

তারিখসভাপতিমন্তব্য
জুলাই ২০২৪ফারুক আহমেদজুলাই অভ্যুত্থানের পর অপ্রত্যাশিত দায়িত্বগ্রহণ
জুলাই ২০২৪আমিনুল ইসলামফারুক আহমেদকে এক রাতের মধ্যে প্রতিস্থাপন
এপ্রিল ২০২৬তামিম ইকবালসরকারি প্রজ্ঞাপনের পর চেয়ারে বসা
২০২৪-২০২৬বিভিন্ন পদক্ষেপনির্বাচিত কমিটি ভেঙে অ্যাডহক কমিটি গঠন

বিসিবিতে রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিটি নির্বাচনে দৃশ্যমান। সরকারি হস্তক্ষেপে নির্বাচনের ফলাফলের আগেই বিজয়ী প্রায় নিশ্চিত হয়। সম্প্রতি তৃতীয়বারের মতো সরকারী মনোনীত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে গঠিত অ্যাডহক কমিটি কার্যকর হয়েছে, যেখানে তিন মন্ত্রীপুত্র ও মন্ত্রীর স্ত্রীর অন্তর্ভুক্তি নজরকাড়া।

২০০১ থেকে ২০০২ সালের অভিজ্ঞতাও নির্দেশ করে যে, নির্বাচিত কমিটি ভেঙে দেওয়ার ঘটনা নতুন নয়। তবে বাংলাদেশ ক্রিকেটের টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার ২৫ বছর অতিক্রান্ত হলেও আঞ্চলিক ক্রিকেটে পর্যাপ্ত সুযোগ–সুবিধা এখনো ঢাকাকেন্দ্রিক। মাঠের খেলায় প্রগতি হলেও, প্রশাসনিক নাটকীয়তা প্রায়ই মূল বিষয় overshadow করে।

বিসিবি চেয়ারে বসার জন্য এই প্রাণান্তকর লড়াই এবং রাজনৈতিক প্রভাবের ক্রমবর্ধমান নাটকীয়তা বাংলাদেশের ক্রিকেটকে এমন এক পরিস্থিতিতে নিয়ে এসেছে, যেখানে মাঠের খেলা প্রায় গোল্লায় যাচ্ছে, আর বোর্ডের চেয়ারই হয়ে উঠছে মূল আকর্ষণ।