উয়ারী-বটেশ্বর প্রত্নতত্ত্বজ্ঞ হাবিবুল্লা পাঠান আর নেই

উয়ারী-বটেশ্বর প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং বাংলার লোকসাহিত্য সংগ্রহের অগ্রদূত, বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক ও গবেষক মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠান আর নেই। আজ, শনিবার বেলা সাড়ে ১১টায় নরসিংদীর বেলাব উপজেলার বটেশ্বর গ্রামে নিজ বাড়িতে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। পরিবার সূত্রে জানা যায়, তিনি দীর্ঘদিন ধরে ফুসফুসের ক্যানসারসহ বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছিলেন। দেড় মাস আগে রাজধানীর একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল তাঁকে। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকের পরামর্শে বাড়িতে আনা হয়েছিল।

হাবিবুল্লা পাঠান স্ত্রী, তিন কন্যা এবং পাঁচ নাতি-নাতনিসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

জীবনী ও গবেষণা

মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠান জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩৯ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি নরসিংদীর বেলাব উপজেলার বটেশ্বর গ্রামে। তাঁর পিতার নাম হানিফ পাঠান, যিনি নিজেও একজন বিশিষ্ট লোকসাহিত্য সংগ্রাহক ও গবেষক ছিলেন। হানিফ পাঠান প্রথমবার উয়ারী-বটেশ্বর প্রত্নস্থানকে জনসমক্ষে উপস্থাপন করেন। বাবার হাত ধরে হাবিবুল্লা পাঠান প্রত্নতাত্ত্বিক সংগ্রহ ও গবেষণার সঙ্গে পরিচিত হন।

১৯৫৫ সালে অষ্টম শ্রেণির ছাত্র থাকাকালীন তিনি বাবার সঙ্গে উয়ারী-বটেশ্বর প্রত্নস্থলের জরিপে অংশ নেন। তাঁদের যৌথ প্রচেষ্টায় উয়ারী-বটেশ্বর অঞ্চলে ব্যাপক প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ সম্পন্ন হয় এবং ২০০০ সালে সেখানে খননের কাজ শুরু হয়।

হাবিবুল্লা পাঠান এবং তাঁর পিতা মিলে প্রতিষ্ঠা করেন বটেশ্বর প্রত্ন সংগ্রহশালা ও গ্রন্থাগার, যেখানে তিন হাজার বছরের পুরোনো বিভিন্ন সরঞ্জাম, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, দুষ্প্রাপ্য বই, ঐতিহাসিক সাময়িকী ও স্মারক সংরক্ষিত আছে।

পুরস্কার ও স্বীকৃতি

বছরপুরস্কার / স্বীকৃতিউল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব
২০০৯বাংলা একাডেমি ফেলোপ্রত্নতাত্ত্বিক ও লোকসাহিত্য গবেষণায় অবদান
২০১৩প্রথম আলো বর্ষসেরা বই‘উয়ারী-বটেশ্বর: শেকড়ের সন্ধানে’ (সুফি মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে)
২০২০বাংলা একাডেমি পুরস্কারউয়ারী-বটেশ্বর ও নরসিংদীর লোকসাহিত্যে অবদান

গ্রন্থসম্ভার

হাবিবুল্লা পাঠান মোট ১৬টি গ্রন্থ রচনা করেছেন, যেগুলো মূলত প্রত্নতত্ত্ব, লোককাহিনী, প্রবাদ, কবিতা ও স্থাননাম বিষয়ক। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হলো:

  • নরসিংদীর কবি সাহিত্যিক (১৯৮৬)
  • নরসিংদীর লৌকিক খেলাধুলা (১৯৮৮)
  • প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন: উয়ারী বটেশ্বর (১৯৮৯)
  • বাংলাদেশের লোককাহিনী, ১ম–৩য় খণ্ড (১৯৯৬–১৯৯৮)
  • উয়ারী-বটেশ্বর: শেকড়ের সন্ধানে (২০১২)
  • বাংলাদেশের লোকসাহিত্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও মুক্তিযুদ্ধ (২০২০)
  • সেকালের মাসিক পত্রিকা সবুজপল্লী (২০২২)

শেষকৃত্য

মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠানের জানাজা আজ, শনিবার, বাদ আসর বিকেল সাড়ে পাঁচটায় বটেশ্বর স্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত হবে। পরে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে।

হাবিবুল্লা পাঠানের জীবন ও গবেষণা শুধুমাত্র নরসিংদী বা উয়ারী-বটেশ্বরকেই আলোকিত করেনি, বরং বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক ও লোকসাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে স্থায়ী প্রভাব রেখে গেছে। তাঁর মৃত্যু বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও গবেষণার অমূল্য ক্ষতি।