বর্তমানে দেশের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান এক কঠিন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অফ বাংলাদেশ (টিসিবি) পরিচালিত ‘ট্রাক সেল’ কর্মসূচিটি সাধারণ মানুষের কাছে কেবল একটি সাশ্রয়ী বাজার নয়, বরং বেঁচে থাকার অন্যতম অবলম্বন হয়ে উঠেছে। রাজধানীর কাজীপাড়া থেকে শুরু করে শেরেবাংলা নগর—প্রতিটি টিসিবি ট্রাকের পেছনে দেখা যাচ্ছে মানুষের দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর বেঁচে থাকার আকুতি।
Table of Contents
ভর্তুকি মূল্যে স্বস্তি বনাম দীর্ঘ অপেক্ষা
টিসিবির ট্রাক থেকে পণ্য কিনলে একজন ক্রেতা সাধারণ বাজারের তুলনায় প্রায় ৪০০ টাকা সাশ্রয় করতে পারেন। বর্তমান বাজার দরের তুলনায় টিসিবির এই বিশেষ প্যাকেজটি নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। নিচে টিসিবির ট্রাক সেল প্যাকেজ ও সাধারণ বাজারের একটি তুলনামূলক চিত্র দেওয়া হলো:
| পণ্যের নাম | টিসিবির দর (প্রতি একক) | সাধারণ বাজার দর (আনুমানিক) | প্যাকেজের পরিমাণ |
| সয়াবিন তেল | ১১৫ টাকা (লিটার) | ১৭০-১৮০ টাকা | ২ লিটার |
| মসুর ডাল | ৭০ টাকা (কেজি) | ১৩০-১৪০ টাকা | ২ কেজি |
| চিনি | ৮০ টাকা (কেজি) | ১৩৫-১৪৫ টাকা | ১ কেজি |
| ছোলা | ৬০ টাকা (কেজি) | ১০০-১১০ টাকা | ১ কেজি |
| খেজুর | ৮০ টাকা (৫০০ গ্রাম) | ২৫০-৩০০ টাকা | ৫০০ গ্রাম |
| মোট খরচ | ৫৫০ টাকা | ৯৫০+ টাকা | সাশ্রয়: ৪০০ টাকা |
সংগ্রামের ভিন্ন ভিন্ন রূপ
এই লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটি মানুষের পেছনে রয়েছে এক একটি জীবন সংগ্রামের গল্প। কাজীপাড়ায় রিকশার পাশে ক্রাচ নিয়ে বসে থাকা নাসির খান তেমনই একজন। বর্জ্যবাহী ভ্যান উল্টে পা হারানো এই মানুষটি তার কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন। স্ত্রী মাহিনুর বেগম অন্যের বাড়িতে কাজ করে যে ৯ হাজার টাকা আয় করেন, তা দিয়ে দুই সন্তানের পড়ালেখা আর সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। মাহিনুর বেগমের আকুতি আর স্বামীর শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় আধঘণ্টা পর তাদের হাতে পণ্য তুলে দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, মোহাম্মদপুরের ডাব বিক্রেতা শাকিলকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে চার ঘণ্টা। এতে তার দোকানের ব্যবসায়িক ক্ষতি হলেও ৪০০ টাকা সাশ্রয় করার তাগিদে তিনি এই কষ্ট মেনে নিয়েছেন। আবার ৭০ বছর বয়সী বৃদ্ধা মুলকুচ বিবি কিংবা এক বছরের শিশুকে কোলে নিয়ে লাইনে দাঁড়ানো মিনুয়ারা বেগমের গল্পগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, ক্ষুধা ও অভাবের কাছে সব কষ্টই গৌণ।
অর্থনৈতিক বাস্তবতার রূঢ় চিত্র
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, ২০২৬ সালের শুরুতেও খাদ্য মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। জানুয়ারিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮.২৯ শতাংশে পৌঁছেছে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, দেশে দারিদ্র্যের হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে পারে, যা প্রায় ৩ শতাংশীয় পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ২২.৯ শতাংশে দাঁড়ানোর ঝুঁকি রয়েছে। এই পরিস্থিতির অর্থ হলো, আরও প্রায় ৩০ লাখ মানুষ চরম দারিদ্র্যের শিকার হতে পারেন। এমন অবস্থায় টিসিবির ৩৫ লাখ ভোক্তার মাঝে ২৩ হাজার টন পণ্য বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা অনেক বড় মনে হলেও চাহিদার তুলনায় তা অপ্রতুল।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও ভবিষ্যৎ করণীয়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হানের মতে, টানা উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিম্নবিত্তের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে। তিনি মনে করেন, টিসিবির বর্তমান বিতরণ ব্যবস্থা আরও আধুনিক ও এলাকাভিত্তিক হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে শিল্পাঞ্চল ও শ্রমজীবী এলাকায় যদি সরাসরি সরবরাহের ব্যবস্থা করা যায়, তবে শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা নষ্ট হবে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের এই কষ্ট লাঘবে সরবরাহ ব্যবস্থা বাড়ানো এবং ডিজিটাল কার্ডের মাধ্যমে সুশৃঙ্খল বিতরণ নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।
আগামী ১২ মার্চ পর্যন্ত শুক্রবার ও ছুটির দিন বাদে এই ট্রাক সেল কর্মসূচি চলমান থাকবে। তবে বাজারের অস্থিরতা না কমলে টিসিবির এই দীর্ঘ লাইন আরও দীর্ঘতর হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
