ঈদের পোশাক কিনতে গিয়ে মায়ের চোখের সামনেই ফাহাদের মৃত্যু

পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে খুশির আমেজ নিয়ে মায়ের সঙ্গে বাজারে গিয়েছিল কিশোর ফাহাদ হোসেন (১৬)। উদ্দেশ্য ছিল নতুন পোশাক কেনা এবং পুরনো সেলাই মেশিনটি মেরামত করা। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই খুশি মুহূর্তেই বিষাদে পরিণত হলো। লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলায় একটি দোকানের নির্মাণাধীন দেয়াল ধসে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারায় এই মেধাবী স্কুলছাত্র। নিজের চোখের সামনে আদরের সন্তানের এমন করুণ মৃত্যু দেখে মা নাছিমা বেগম বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন; বর্তমানে তিনি অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

দুর্ঘটনার বিস্তারিত ও প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ

ঘটনাটি ঘটেছে রোববার (৮ মার্চ) দুপুরে রামগঞ্জ উপজেলা শহরের অত্যন্ত ব্যস্ততম চৌরাস্তা এলাকায়। প্রত্যক্ষদর্শী ও সিসিটিভি ফুটেজ সূত্রে জানা গেছে, ফাহাদ তার মায়ের সঙ্গে ‘আল মনসুর ড্রাগ হাউস’ নামক একটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। তারা সেখানে একটি সেলাই মেশিন মেরামতের জন্য দিয়েছিলেন। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ফাহাদ তার মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে থাকার সময় হঠাৎ এক পা ডান দিকে বাড়াতেই ওপর থেকে নির্মাণাধীন দোকানের ছাদের পুরনো একটি দেয়াল সরাসরি তার ওপর ধসে পড়ে।

স্থানীয়রা তাৎক্ষণিকভাবে ধসে পড়া ইট ও রাবিশ সরিয়ে ফাহাদকে উদ্ধার করে রামগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। তবে হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মৃত ঘোষণা করেন। এই মর্মান্তিক ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ

এই দুর্ঘটনায় কেবল ফাহাদই নয়, আরও অন্তত ৫ জন পথচারী আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে একজনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। আহতদের প্রাথমিক তথ্য নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:

দুর্ঘটনায় হতাহতদের তালিকা

নামপরিচয়বর্তমান অবস্থা
ফাহাদ হোসেন (১৬)এসএসসি পরীক্ষার্থী, বাঁশঘর গ্রামমৃত ঘোষণা করা হয়েছে
খোরশেদ আলমবাসিন্দা, ইছাপুর ইউনিয়নকোমর ভেঙে যাওয়ায় ঢাকায় প্রেরণ
নাছিমা বেগমনিহতের মামানসিকভাবে বিপর্যস্ত ও চিকিৎসাধীন
অন্যান্য ৪ জনস্থানীয় পথচারীপ্রাথমিক চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরেছেন

নিহতের পারিবারিক পরিচয়

নিহত ফাহাদ হোসেন রামগঞ্জ পৌরসভার বাঁশঘর গ্রামের আহমদ আলী গাজী বাড়ির সৌদি প্রবাসী আলমগীর হোসেন বকুলের ছেলে। সে স্থানীয় নিচহরা উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল। সামনেই তার পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু একটি অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণকাজের বলি হয়ে তার জীবনের সব স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গেল। প্রবাসে থাকা তার বাবা ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন।

প্রশাসনের ভূমিকা ও আইনি পদক্ষেপ

রামগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফিরোজ উদ্দিন চৌধুরী ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, ফাহাদ ও তার মা মূলত পথচারী ছিলেন। দোকানের জরাজীর্ণ দেয়ালটি কোনো প্রকার নিরাপত্তা বেষ্টনী ছাড়াই সংস্কার করা হচ্ছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতাল মর্গে পাঠিয়েছে। ওসি আরও জানান, ঘটনার তদন্ত চলছে এবং নির্মাণকাজে কোনো অবহেলা ছিল কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত এই ঘটনায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না নিয়ে এমন ঝুঁকিপূর্ণ ভবন সংস্কার করার কারণেই এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। তারা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।