রাবাত, মার্চ ২০২৫: মরক্কোর রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ এ বছর ঈদুল আজহার পশু কোরবানি থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। দেশটিতে গবাদি পশুর তীব্র সংকটের ফলে কোরবানির প্রচলিত রীতি চালিয়ে যাওয়া নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
খরা ও গবাদি পশুর সংকট:
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মরক্কো টানা সাত বছর ধরে ভয়াবহ খরার সম্মুখীন, যার ফলে গত এক দশকে দেশটির ভেড়ার সংখ্যা প্রায় ৩৮% কমে গেছে। কৃষিখাতের এই ধস মাংসের বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে, ফলে দাম বেড়েছে অনেকগুণ। এই সংকট মোকাবিলায় মরক্কো সরকার অস্ট্রেলিয়া থেকে এক লাখ ভেড়া আমদানি করেছে, তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম।
ঐতিহ্য ও বাস্তবতার সংঘাত:
ঈদুল আজহা মুসলিমদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব, যা নবী ইবরাহিম (আ.)-এর ত্যাগের স্মরণে পালিত হয়। সাধারণত মুসলিমরা এই দিনে ভেড়া, ছাগল বা গরু কোরবানি দিয়ে এর মাংস পরিবারের সদস্য, প্রতিবেশী ও দরিদ্রদের মধ্যে বণ্টন করেন। কিন্তু মরক্কোতে ক্রমাগত খরার কারণে পশু সরবরাহ ও মূল্য নিয়ন্ত্রণ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
জাতীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক ভাষণে দেশটির ধর্মমন্ত্রী রাজার বার্তা পড়ে শোনান, যেখানে বলা হয়, বর্তমান কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতায় নিম্নবিত্তের জন্য কোরবানির ব্যয়ভার বহন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠবে। তাই, জনগণকে পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিকল্প পথ খুঁজতে হবে।
ঐতিহাসিক নজির ও সরকারি পদক্ষেপ:
এই আহ্বান মরক্কোর ইতিহাসে নতুন কিছু নয়। ১৯৬৬ সালে একই রকম ভয়াবহ খরার সময় রাজা হাসান দ্বিতীয়ও ঈদুল আজহার কোরবানি থেকে বিরত থাকার জন্য জনগণকে অনুরোধ করেছিলেন।
খরার কারণে কৃষির উপর যে চাপ সৃষ্টি হয়েছে, তা মোকাবিলায় মরক্কোর সরকার বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। কৃষিমন্ত্রী আহমেদ বোয়ারি জানিয়েছেন, বর্তমানে পানির সরবরাহ সুরক্ষিত রাখা সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। ইতিমধ্যেই কঠোর পানি সংরক্ষণ নীতি ও সেচ ব্যবস্থার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, যা গবাদি পশুর খামারগুলোকে চরম চাপে ফেলেছে।
এছাড়া, খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ করতে সরকার গবাদি পশু, উট ও লাল মাংসের ওপর আরোপিত আমদানি শুল্ক ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) প্রত্যাহার করেছে, যাতে সাধারণ মানুষের জন্য এগুলো কিছুটা সহজলভ্য হয়।
আঞ্চলিক সংকট ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ:
মরক্কোর এই সংকট উত্তর আফ্রিকার বৃহত্তর জলবায়ুগত সমস্যারই অংশ। অঞ্চলটির বিভিন্ন দেশ পানির ঘাটতি, কৃষি উৎপাদন হ্রাস ও খাদ্যের উচ্চমূল্যের মতো সংকটের সম্মুখীন হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতা সামনে রেখে অনেক দেশ তাদের ঐতিহ্যবাহী উৎসব ও সামাজিক রীতিনীতিতে পরিবর্তন আনতে বাধ্য হচ্ছে।
যতই ঈদের দিন এগিয়ে আসছে, মরক্কোর জনগণকে ঐতিহ্য ও ধর্মীয় অনুশাসনের মধ্যে সমন্বয় করে নতুনভাবে এই দিন উদযাপনের পথ খুঁজতে হবে, যা পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক হবে।
