ইসির নিষেধাজ্ঞায় কক্সবাজারে পর্যটন স্থবির ও সৈকত জনশূন্য

বাংলাদেশের প্রধান পর্যটন নগরী কক্সবাজার এখন এক ভিন্ন ও নীরব রূপে বিদ্যমান। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও দেশজুড়ে পরিচালিত গণভোটকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ৮২ ঘণ্টার এক কঠোর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এই সিদ্ধান্তের সরাসরি প্রভাবে চিরচেনা কোলাহলময় কক্সবাজার কার্যত পর্যটকশূন্য হয়ে পড়েছে। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী, এই নির্ধারিত সময়ে কোনো ব্যক্তি নিজ এলাকার বাইরে অবস্থান করতে পারবেন না, যা পর্যটন নির্ভর এই জেলাটিতে এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।

নিষেধাজ্ঞার সময়কাল ও প্রশাসনের কঠোর অবস্থান

কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মো. শাহিদুল আলম জানিয়েছেন, নির্বাচন কমিশনের জারি করা এই নিষেধাজ্ঞা ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে শুরু হয়েছে এবং এটি আগামী ১৩ ফেব্রুয়ারি বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। এই ৮২ ঘণ্টা কক্সবাজারের সকল হোটেল-মোটেল ও গেস্টহাউসকে নতুন কোনো কক্ষ ভাড়া না দেওয়ার জন্য কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মূলত নিরাপত্তার স্বার্থে এবং নির্বাচনী এলাকার বাইরের মানুষের অনুপ্রবেশ ঠেকাতেই এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে ইসি।

নিচে নির্বাচনী নিষেধাজ্ঞার মূল বিষয়বস্তু ও প্রভাব তুলে ধরা হলো:

বিষয়বিবরণ
নিষেধাজ্ঞার কারণত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ২০২৬
নিষেধাজ্ঞার মোট সময়কাল৮২ ঘণ্টা
কার্যকর শুরুর সময়১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, সকাল ৭:৩০ মিনিট
কার্যকর শেষের সময়১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, বিকাল ৪:৩০ মিনিট
মূল বিধিনিষেধবহিরাগতদের প্রবেশ নিষেধ ও হোটেল বুকিং বন্ধ
প্রভাবিত এলাকাকক্সবাজার সমুদ্রসৈকত, কলাতলী, সুগন্ধা ও লাবণী পয়েন্ট

সৈকতের বর্তমান অবস্থা: নীরবতায় ঢাকা নীল জলরাশি

সাধারণত যে সমুদ্রসৈকতে বছরের প্রতিটি দিন তিল ধারণের জায়গা থাকে না, মঙ্গলবার সরেজমিনে সেখানে দেখা গেছে একদম ভিন্ন চিত্র। লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টে কোনো পর্যটকের দেখা মেলেনি। সৈকতের ছাতাগুলো (কিটকট) পড়ে আছে খালি, আর ঘোড়সওয়ার ও ফটোগ্রাফারদের হাঁকডাকও একদম স্তিমিত। সৈকতে কেবল হাতেগোনা কিছু স্থানীয় বাসিন্দার দেখা মিলেছে। স্থানীয় বাসিন্দা শাহেদুল ইসলামের মতে, সৈকতের এমন জনশূন্য রূপ তিনি গত কয়েক বছরের মধ্যে দেখেননি। জনশূন্য সৈকতের এই নিরিবিলি পরিবেশকে স্থানীয় শিক্ষার্থীরা উপভোগ করলেও পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মনে জমেছে দুশ্চিন্তার মেঘ।

পর্যটন খাতে ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা

ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার ফলে কক্সবাজারের কয়েক শ হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট এখন অতিথিহীন। হোটেল ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পর থেকেই পূর্বনির্ধারিত রুম বুকিংগুলো বাতিল হতে শুরু করে। হোটেল-মোটেল ছাড়াও রেস্টুরেন্ট, পর্যটন তরী, হস্তশিল্পের দোকান এবং ক্ষুদ্র বিচ ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য এই আত্মত্যাগ প্রয়োজনীয় হলেও, পর্যটন শিল্পের এই বিশাল ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে কিছুটা সময় লাগবে।

সব মিলিয়ে, নির্বাচনের এই ৮২ ঘণ্টা কক্সবাজার কেবল একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়, বরং এক কঠোর প্রশাসনিক নজরদারির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ১৩ ফেব্রুয়ারি বিকেলের পর নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে পুনরায় পর্যটকদের আনাগোনায় মুখরিত হবে এই সৈকত—এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।