ইরান যুদ্ধ: ‘প্ল্যান বি’-র কৌশল ও টিকে থাকার বাস্তবতা

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান–যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রাথমিক পরিকল্পনা সরাসরি কার্যকর হচ্ছে না। যদিও অনেক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক নেতা দাবি করছেন, যুদ্ধ প্রায় শেষের দিকে, বাস্তবতা ভিন্ন। ইরানের শাসনব্যবস্থা এখনও অটুট রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের ‘প্ল্যান এ’ ব্যর্থ হওয়ায় তারা এখন ‘প্ল্যান বি’ প্রয়োগে বাধ্য হয়েছে।

মূল পরিকল্পনা ছিল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা এবং ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর শীর্ষ নেতাদের হত্যা করা। লক্ষ্য ছিল নেতৃত্ব দুর্বল করে দেশের ইসলামি শাসনব্যবস্থা ধ্বংস করা। তবে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী এই পরিকল্পনা সফল হয়নি। তেহরানে, ৯ মার্চ ২০২৬, সমর্থকরা নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির ছবি উত্থাপন করে প্রমাণ দিয়েছে, ইরান এখনও নেতৃত্বহীন নয়।

‘প্ল্যান বি’-এর কৌশল ও উপাদান

‘প্ল্যান বি’-এর দুটি মূল উপাদান রয়েছে।

১. অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ সৃষ্টি: সংখ্যালঘু গোষ্ঠী যেমন কুর্দি ও বালুচদের সঙ্গে কাজ করে ইরানের ভেতরে বিদ্রোহ শুরু করা। উদ্দেশ্য হলো অভ্যন্তরীণ চাপ সৃষ্টি করা, তবে বাস্তবে এই উপায় সীমিত প্রভাব ফেলে। কারণ এই গোষ্ঠীগুলো সরাসরি ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থা রাখে না।

২. দাহিয়া নীতি প্রয়োগ: যদি কোনো রাষ্ট্রের নেতৃত্বকে দমন করা বা বশে আনা সম্ভব না হয়, তাহলে বিজয়ের পথ হলো বেসামরিক জনগণের ওপর অবিরাম কৌশলগত হামলা। এই নীতি ২০০৬ সালের লেবাননের দাহিয়া উপশহরের হিজবুল্লাহ অভিযান থেকে উদ্ভূত।

গত ৩০ মাসে গাজায় হামাসের বিরুদ্ধে এই নীতি প্রয়োগের ফলে অন্তত ৭০,০০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং অধিকাংশ অঞ্চল ধ্বংস হয়েছে। এই বাস্তবতা সত্ত্বেও ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী ইরানের বিরুদ্ধে একই নীতি প্রয়োগ করছে।

সাম্প্রতিক ধ্বংসযজ্ঞ ও প্রভাব

লক্ষ্যবস্তুআক্রমণের ধরণসম্ভাব্য প্রভাবমন্তব্য
তেহরান, জ্বালানি ডিপোস্থল ও বোমা হামলাজ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত, আগুন ছড়িয়ে পড়াতেল ও গ্যাস সরবরাহে ক্ষতি
ইরান, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রবিমান হামলাপারমাণবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাতসরাসরি ক্ষতি সীমিত, অবকাঠামো টিকে আছে
লেবানন, দাহিয়া উপশহরস্থল ও বিমান হামলাহিজবুল্লাহ ঘাঁটি ধ্বংসবেসামরিকদের ওপর চাপ বৃদ্ধি
পশ্চিম উপসাগরীয় তেল-সাইটসম্ভাব্য হামলাবিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি১৯৭৩–৭৪ সালের ওপেক সংকটের পুনরাবৃত্তি সম্ভাব্য

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের এই কৌশল দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যাপক ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে, যা ইরানের সাধারণ জনগণের ওপর ভয়ঙ্কর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে বাস্তবতা হলো, ইরান সীমিত শক্তিতে টিকে থাকার কৌশল অব্যাহত রাখছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী বর্তমানে তৃতীয় বিমানবাহী নৌবহর মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা যুদ্ধকে আরও বিস্তৃত ও জটিল করবে। এর ফলে ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ধ্বংসযজ্ঞ ও মানবিক সংকট দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে।

অর্থাৎ, ‘প্ল্যান বি’ প্রয়োগ করা হলেও সম্পূর্ণ বিজয় এখনো অচিন্তনীয়, এবং ইরান নিজেদের সীমিত ক্ষমতা ব্যবহার করে কৌশলগতভাবে টিকে থাকার চেষ্টা অব্যাহত রাখছে। এই পরিস্থিতি যুদ্ধকে আরও জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী করে তুলেছে, যেখানে স্রেফ সামরিক শক্তি নয়, কৌশল, ধৈর্য ও আন্তর্জাতিক কূটনীতি নির্ধারণ করবে ফলাফল।