মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে লেবাননভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। সংগঠনটির শীর্ষ নেতা শেখ নাঈম কাসেম স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের ওপর কোনো ধরনের বহিঃশত্রুর আক্রমণ বা আঘাত আসলে হিজবুল্লাহ কখনোই নিরপেক্ষ বা নীরব দর্শক হয়ে থাকবে না। সোমবার এক সংহতি অনুষ্ঠানে ভিডিও লিংকের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে তিনি এই অবস্থান ব্যক্ত করেন।
Table of Contents
ইরানের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ
নাঈম কাসেম তাঁর বক্তব্যে হিজবুল্লাহ ও ইরানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের কৌশলগত ও আদর্শিক সম্পর্কের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি জানান, ইরান এবং দেশটির নেতৃত্বের প্রতি হিজবুল্লাহর অবিচল আস্থা ও পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ গণমাধ্যম আল-মানার টেলিভিশন জানিয়েছে, নাঈম কাসেম তাঁর বক্তব্যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, খামেনির বিরুদ্ধে যে কোনো ধরনের হুমকি বা উসকানিকে হিজবুল্লাহ সরাসরি নিজেদের ওপর আসা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করবে।
পশ্চিমা ষড়যন্ত্রের প্রেক্ষাপট
হিজবুল্লাহর এই শীর্ষ নেতা ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পরবর্তী সময় থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে পশ্চিমা বিশ্বের, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, বিপ্লবের সূচনালগ্ন থেকেই ওয়াশিংটন তেহরানের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার জন্য বহুমুখী ষড়যন্ত্র করে আসছে। নাঈম কাসেমের মতে, আশির দশকে ইরাক-ইরান যুদ্ধের নেপথ্যেও ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উসকানি, যেখানে তৎকালীন ইরাক সরকারকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল।
ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য যেকোনো আগ্রাসনের প্রতিবাদে হিজবুল্লাহর এই কঠোর অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, হিজবুল্লাহর এই ঘোষণা ইসরায়েল ও তার মিত্রদের জন্য একটি সরাসরি বার্তা।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার প্রধান কারণ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষসমূহ
আঞ্চলিক নিরাপত্তার বর্তমান সংকটের মূলে থাকা পক্ষগুলো এবং তাদের অবস্থানের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
| পক্ষ | বর্তমান অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গি |
| ইরান | পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রভাব রক্ষায় অনড়। কোনো হামলার শিকার হলে কঠোর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি। |
| হিজবুল্লাহ | ইরানের প্রধান আঞ্চলিক মিত্র। ইরানের ওপর হামলা হলে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর ঘোষণা। |
| যুক্তরাষ্ট্র | ইরানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রেখেছে। ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। |
| ইসরায়েল | ইরানকে অস্তিত্বের সংকট হিসেবে দেখে। প্রয়োজনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় সামরিক হামলার সম্ভাবনা নাকচ করেনি। |
আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা
নাঈম কাসেমের এই ঘোষণা এমন এক সময়ে এলো যখন লোহিত সাগর থেকে শুরু করে লেবানন সীমান্ত পর্যন্ত পুরো মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের ছায়া বিস্তৃত হচ্ছে। হিজবুল্লাহর হাতে থাকা অত্যাধুনিক মিসাইল ও ড্রোন ভাণ্ডার এই অঞ্চলে বড় ধরনের যুদ্ধের শঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে। যদি সত্যিই ইরান আক্রমণের শিকার হয় এবং হিজবুল্লাহ তাতে যুক্ত হয়, তবে এটি কেবল লেবানন বা ইরান নয়, বরং পুরো বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
উপসংহারে বলা যায়, হিজবুল্লাহর এই অবস্থানের মাধ্যমে এটি পরিষ্কার যে, মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিরোধ কামী গোষ্ঠীগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সংগঠিত এবং তারা তাদের মিত্রদের রক্ষায় যে কোনো চরম পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।
