ইরানে হামলার তীব্র বিরোধিতা চীনের, ইসরাইলকে কড়া বার্তা

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে চরম উত্তেজনার পারদ চড়ছে। ইরান ও ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সংঘাতের চতুর্থ দিনে এসে বিশ্ব পরাশক্তি চীন তার অবস্থান অত্যন্ত জোরালোভাবে পরিষ্কার করেছে। আজ মঙ্গলবার (৩ মার্চ) চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ইসরাইলি পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিওন সার-এর সাথে এক টেলিফোন আলাপে ইরানের ওপর পরিচালিত সামরিক হামলার তীব্র বিরোধিতা প্রকাশ করেছেন। বেইজিং মনে করে, শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরানো অসম্ভব এবং এটি দীর্ঘমেয়াদী সংকটের বীজ বপন করবে।

বেইজিংয়ের অবস্থান ও কূটনৈতিক বার্তা

চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া-র তথ্যমতে, ওয়াং ই তার ইসরাইলি প্রতিপক্ষকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, বেইজিং কোনোভাবেই ইরানের ওপর এই যৌথ সামরিক অভিযানকে সমর্থন করে না। ইরানের শীর্ষ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ওপর পরিচালিত হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের ‘গুরুতর লঙ্ঘন’ হিসেবে ইতোমধ্যেই নিন্দা জানিয়েছে চীন। যদিও আলোচনার শুরুতে তিনি সরাসরি কঠোর ভাষা প্রয়োগ থেকে কিছুটা সংযত ছিলেন, তবে আলোচনার এক পর্যায়ে বেইজিংয়ের দীর্ঘদিনের নীতি— ‘আলোচনা ও পরামর্শের মাধ্যমে সমাধান’—এর ওপর সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেন।

ওয়াং ই আক্ষেপ করে বলেন, “সাম্প্রতিক সময়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে বেশ কিছু অগ্রগতি অর্জিত হচ্ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সামরিক অভিযানের ফলে সেই শান্তিপূর্ণ পথটি রুদ্ধ হয়ে গেছে।” তার মতে, এই হামলা কেবল নতুন সমস্যার জন্ম দেবে না, বরং এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে।

ইরান-ইসরাইল সংকটে বৈশ্বিক শক্তির অবস্থান

বর্তমান সংকটকালীন পরিস্থিতিতে প্রধান পক্ষগুলোর অবস্থান নিচে টেবিল আকারে তুলে ধরা হলো:

পক্ষ/রাষ্ট্রবর্তমান অবস্থান ও ভূমিকামূল দাবি/মন্তব্য
চীনতেহরানের ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সহযোগী।অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধ এবং আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনের আহ্বান।
ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রযৌথ সামরিক অভিযান পরিচালনাকারী।নিরাপত্তার খাতিরে এবং হুমকি নির্মূলে হামলাকে অপরিহার্য বলে দাবি করছে।
ইরানআক্রান্ত রাষ্ট্র এবং প্রতিরোধের ঘোষণা।সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগ ও পাল্টা জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি।
আন্তর্জাতিক মহলযুদ্ধবিরতির জন্য কূটনৈতিক চাপ।সংঘাত যেন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের রূপ না নেয়, সেদিকে সতর্ক নজর।

সংঘাতের সম্ভাব্য পরিণতি ও চীনের উদ্বেগ

চীন সতর্ক করে দিয়েছে যে, এই সংঘাত যদি এখনই নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে এটি পুরো অঞ্চলের সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিতে পারে। ওয়াং ই স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “শক্তি দিয়ে কোনোদিন সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। বরং এটি প্রতিহিংসার একটি অবারিত চক্র তৈরি করে যা নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।” চীন মনে করে, ইরান একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তি এবং তাদের ওপর আক্রমণ পুরো জ্বালানি বাজার ও বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।

উপসংহার ও ভবিষ্যৎ পথরেখা

চীনের এই অবস্থান কেবল তেহরানের প্রতি সমর্থন নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের বহিঃপ্রকাশ। এর আগে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে ঐতিহাসিক চুক্তিতে মধ্যস্থতা করে চীন নিজেকে শান্তির দূত হিসেবে প্রমাণ করেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতেও বেইজিং চাইছে দ্রুত সামরিক কার্যক্রম বন্ধ করে টেবিলের আলোচনায় ফিরে আসতে। তবে ইসরাইল চীনের এই বার্তার জবাবে কতটা সংযত হবে, তা এখন সময়ের অপেক্ষা। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চীনের এই শক্ত অবস্থানের পর ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের ওপর বিশ্বজনমতের চাপ আরও বৃদ্ধি পাবে।