ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট ও পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে ঘনীভূত হচ্ছে যুদ্ধের কালো মেঘ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ইরানে বর্তমান সরকার পরিবর্তন হওয়াই হবে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ‘সবচেয়ে ভালো উপায়’। নর্থ ক্যারোলাইনার ফোর্ট ব্র্যাগ সামরিক ঘাঁটিতে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি তেহরানের ধর্মীয় নেতৃত্বকে উৎখাতের এই প্রকাশ্য ইঙ্গিত দেন। ট্রাম্পের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো যখন ওয়াশিংটন মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক শক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করছে।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক তৎপরতা ও রণতরি মোতায়েন
ইরানের ওপর চরম চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তাদের দ্বিতীয় বিমানবাহী রণতরি পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম এবং অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড খুব শীঘ্রই এই অঞ্চলের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবে। এর আগে থেকেই সেখানে অবস্থান করছে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন। ভেনেজুয়েলায় অভিযানের পর ক্যারিবীয় সাগরে অবস্থান করা এই বিশাল রণতরি মোতায়েনকে ইরানের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দেখছেন সামরিক বিশ্লেষকরা।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “যদি আমরা কোনো পারমাণবিক চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হই, তবে আমাদের এই সামরিক শক্তিরই প্রয়োজন পড়বে।” নিচে বর্তমানে ওই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক প্রস্তুতির একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র দেওয়া হলো:
| রণতরি/সামরিক সরঞ্জাম | বর্তমান অবস্থান/অবস্থা | প্রধান উদ্দেশ্য |
| ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড | মধ্যপ্রাচ্যের পথে রওয়ানা | ইরানের ওপর সর্বোচ্চ সামরিক চাপ প্রয়োগ |
| ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন | মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে মোতায়েন | আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও নজরদারি |
| মার্কিন বিশেষ বাহিনী | ওমান ও সংলগ্ন ঘাঁটিসমূহ | সম্ভাব্য কয়েক সপ্তাহের সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি |
| অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা | কার্যকর (ডলার সংকট সৃষ্টি) | রিয়ালের দরপতন ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা তৈরি |
অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়
ইরানে সরকার পরিবর্তনের আহ্বানের নেপথ্যে রয়েছে দেশটির বর্তমান অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা। গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর থেকে ইরানে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও মুদ্রাস্ফীতির প্রতিবাদে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের মতে, ওয়াশিংটন পরিকল্পিতভাবে ইরানে ডলারের ঘাটতি সৃষ্টি করেছিল, যার ফলে রিয়ালের নজিরবিহীন দরপতন ঘটে এবং সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি অনুযায়ী, এই বিক্ষোভ দমনে সরকারি বাহিনীর কঠোর হস্তক্ষেপে ইতিমধ্যে কয়েক হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
ইরানের নির্বাসিত শাহজাদা রেজা পাহলভি মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি ‘মানবিক হস্তক্ষেপের’ আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি মনে করেন, সাধারণ ইরানিদের জীবন বাঁচাতে আন্তর্জাতিক সংদায়ের এগিয়ে আসা এখন সময়ের দাবি।
কূটনৈতিক অচলায়তন ও যুদ্ধের মেঘ
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। যদিও সম্প্রতি ওমানের রাজধানী মাসকাটে দুই দেশের প্রতিনিধিরা পারমাণবিক ইস্যুতে গোপন বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন, তবে তাতে কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ, ইরান গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে, যা তেহরান বরাবরই অস্বীকার করে আসছে।
মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের নির্দেশ পাওয়ামাত্র ইরানে কয়েক সপ্তাহব্যাপী বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে। যদি এই সংঘাত শুরু হয়, তবে তা গত কয়েক দশকের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। ট্রাম্প সরাসরি আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বিকল্প কারো নাম না বললেও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, পরিবর্তনের জন্য উপযুক্ত নেতৃত্ব তাদের বিবেচনায় রয়েছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার উত্তেজনা এক অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে।
