ইরানের দীর্ঘায়িত কৌশল: যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি হারানো নয়

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক দাবি অনুযায়ী, তাদের সাম্প্রতিক যৌথ বিমান হামলায় ইরানের সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সামাজিক মাধ্যম ‘ট্রুথ’-এ লিখেছেন, “তাদের আকাশ-প্রতিরোধ ব্যবস্থা, বিমান বাহিনী, নৌবাহিনী এবং নেতৃত্ব প্রায় অপ্রতুল।” তিনি আরও লিখেছেন, “ওরা আলোচনায় বসতে চেয়েছিল। আমি বলেছি, অনেক দেরি হয়ে গেছে!”

ইরান পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে দাবি করেছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করা হয়েছে আত্মরক্ষার স্বার্থে। তবে সামরিক দিক থেকে ইরান এখনও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের তুলনায় পিছিয়ে আছে। এই প্রেক্ষাপটে ইরানের কৌশল হলো সরাসরি যুদ্ধ নয়, বরং ‘ক্ষয় করার যুদ্ধ’ বা attrition warfare, যা প্রতিপক্ষের শক্তি ক্ষয় করে দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা অর্জন করার ওপর কেন্দ্রিত।

ইরানের কৌশল ও সামরিক সক্ষমতা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান প্রথাগত যুদ্ধে জেতার চেষ্টা করছে না, বরং প্রতিপক্ষকে অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে ব্যর্থ করে দেয়ার লক্ষ্য রাখছে। ফ্রান্সের সিয়ঁসপোয়ার সহকারী অধ্যাপক নিকোল গ্রাজেউস্কি বলেন, “ইরান এই কৌশলে শত্রু দেশের অস্ত্র, সরঞ্জাম ও লোকবল ক্রমাগত কমিয়ে আনে, এবং যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের লড়াই করার সক্ষমতা অব্যাহত থাকে, ক্ষতি চালিয়ে যায়।”

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা মূল কৌশলের অংশ। ইরান ‘সেজিল’ (প্রায় ২,০০০ কিমি) ও ‘ফাতাহ’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে, পাশাপাশি ‘শাহেদ’ ড্রোন দিয়ে প্রতিপক্ষকে ইন্টারসেপ্টার মিসাইল খরচ করতে বাধ্য করছে।

সামরিক উপাদানপরিমাণ/ক্ষমতামন্তব্য
ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রপ্রায় ২,৫০০স্বল্প ও মধ্যম দূরত্বের সমন্বয়
সৈন্য সংখ্যা৬,১০,০০০সরাসরি সেনাবাহিনীতে ৩,৫০,০০০; ইসলামী রেভল্যুশনারি গার্ডস ১,৯০,০০০
ড্রোনহাজারেরও বেশি ‘শাহেদ’একমুখী আক্রমণে প্রস্তুত, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি অনুকরণযোগ্য
আঞ্চলিক মিত্রহুতি, হেজবুল্লাহ, হামাসঅঞ্চলের বিভিন্ন সংঘাতে সক্রিয়

ইরান ‘মিসাইল সিটি’ বা মাটির নিচে গড়ে তোলা ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারের মাধ্যমে তার শক্তি বজায় রাখছে। যদিও মার্কিন কমান্ডার ড্যান কেইনের মতে, ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ নাগাদ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ ৮৬ শতাংশ কমেছে, এবং মার্চের ৪ তারিখে আরও ২৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

সংঘাতের দীর্ঘায়িত প্রভাব

ইরানের বড়ো লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব ফেলা। বিশ্বের তেলের প্রায় ২০% এই প্রণালী দিয়ে চলে, যা সামান্য বিঘ্নেও বৈশ্বিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে।

তবে সংঘাতের দীর্ঘায়িত হওয়ার সম্ভাবনা ইরানের অভ্যন্তরীণ সংহতির ওপর নির্ভর করছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে বিভাজন থাকলে, সামরিক কৌশল যথাযথ কার্যকর নাও হতে পারে। একই সময়ে যুদ্ধে ক্লান্তি ও চাপ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপে ভুল ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে।

ইরানের কৌশল, যা সরাসরি বিজয় নয় বরং ‘ক্ষয় করা’ এবং প্রতিপক্ষকে অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে ব্যর্থ করা, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। উপসাগরীয় দেশগুলির অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা এই সংঘাতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এই পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, ইরান যুদ্ধের সরাসরি জয় না পেলেও, দীর্ঘায়িত ও কৌশলগত সংঘাতের মাধ্যমে অঞ্চলীয় প্রভাব বজায় রাখার পরিকল্পনা করছে।