ইন্টারসেপ্টর সংকটে চাপে ইসরায়েল

ক্রমবর্ধমান ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় গুরুতর চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে ব্যবহৃত ইন্টারসেপ্টর দ্রুত ফুরিয়ে আসায় দেশটির নিরাপত্তা ব্যবস্থায় অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। যুদ্ধের তৃতীয় সপ্তাহে এসে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে, এবং এ নিয়ে ইসরায়েল ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্কবার্তা দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, গত বছর ইরানের সঙ্গে সংঘর্ষে বিপুল পরিমাণ ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করার ফলে ইসরায়েলের মজুত আগেই উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল। চলমান সংঘাতে ইরানের ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষণ সেই ঘাটতিকে আরও প্রকট করে তুলেছে। ফলে ইসরায়েলের দূরপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক বর্তমানে প্রবল চাপের মধ্যে রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান তাদের কিছু ক্ষেপণাস্ত্রে গুচ্ছ বোমা সংযুক্ত করায় সেগুলোকে মাঝপথে প্রতিহত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। এই ধরনের অস্ত্র আকাশে বিস্ফোরিত হয়ে একাধিক উপবস্তুতে বিভক্ত হয়, যার ফলে প্রতিটি লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে আলাদা ইন্টারসেপ্টর প্রয়োজন হয়। এতে করে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল সংখ্যক ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা মজুত দ্রুত শেষ হওয়ার অন্যতম কারণ।

একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, এই সংকট নতুন নয়; বরং কয়েক মাস আগেই এর পূর্বাভাস পাওয়া গিয়েছিল। তিনি বলেন, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম দ্রুত ফুরিয়ে যেতে পারে—এটি তাদের পূর্বপরিকল্পনায় ছিল। তবে তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব মজুত পর্যাপ্ত রয়েছে এবং তারা এই মুহূর্তে কোনো সংকটে নেই। তবুও প্রশ্ন উঠেছে, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে অতিরিক্ত ইন্টারসেপ্টর সরবরাহ করবে কি না—এ বিষয়ে এখনো স্পষ্ট সিদ্ধান্ত জানা যায়নি।

এদিকে, যুদ্ধের নতুন মাত্রা যোগ করেছে ইরানের উন্নত প্রযুক্তির সেজিল-২ ক্ষেপণাস্ত্র, যা ‘ড্যান্সিং মিসাইল’ নামে পরিচিত। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ক্ষেপণাস্ত্র আকাশপথে চলার সময় বারবার গতিপথ পরিবর্তন করতে সক্ষম, ফলে প্রচলিত রাডার ব্যবস্থা এর গতিবিধি নির্ণয়ে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে।

ইরানের বিপ্লবী গার্ড দাবি করেছে, সাম্প্রতিক হামলায় ইরাকের আল-হারির বিমানঘাঁটি, কুয়েতের আলি আল সালেম বিমানঘাঁটি এবং ক্যাম্প আরিফজানের মতো গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে সেজিল-২ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সমন্বিত আক্রমণ চালানো হয়েছে। এতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সেজিল-২ ক্ষেপণাস্ত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর গতিশীল গতিপথ পরিবর্তনের ক্ষমতা। লক্ষ্যবস্তুর দিকে ধাবিত হওয়ার সময় এটি হঠাৎ দিক পরিবর্তন করে, যা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পূর্বাভাসকে ব্যর্থ করে দেয়। এছাড়া এতে অ্যান্টি-রাডার আবরণ থাকায় রাডারের পক্ষে একে শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি পৌঁছে এই ক্ষেপণাস্ত্র অতিদ্রুত গতিতে পৌঁছায়, ফলে প্রতিরোধের সময়সীমা অত্যন্ত সংকুচিত হয়ে যায়।

নিচে বর্তমান পরিস্থিতির একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হলো—

বিষয়অবস্থা
ইন্টারসেপ্টর মজুতদ্রুত কমছে
ইরানের হামলার ধরনধারাবাহিক ও বহুমাত্রিক
ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রসেজিল-২ সহ উন্নত প্রযুক্তির অস্ত্র
প্রতিরোধের চ্যালেঞ্জগতিপথ পরিবর্তন, গুচ্ছ বোমা, অ্যান্টি-রাডার প্রযুক্তি
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানপর্যাপ্ত মজুত, সহায়তা অনিশ্চিত

সার্বিকভাবে, ইন্টারসেপ্টর ঘাটতি এবং ইরানের উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির সম্মিলিত প্রভাব ইসরায়েলের জন্য একটি জটিল নিরাপত্তা সংকট তৈরি করেছে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে এই চাপ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।