ইউক্রেনে খনি শ্রমিকদের বাসে রাশিয়ার ড্রোন হামলা: নিহত ১২

রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ যখন চতুর্থ বছরে পদার্পণ করতে যাচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে বেসামরিক ও কৌশলগত স্থাপনায় হামলার তীব্রতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। গত রোববার ইউক্রেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় দিনিপ্রোপেত্রোভস্ক অঞ্চলে খনি শ্রমিকদের বহনকারী একটি বাসে রাশিয়ার ড্রোন হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছেন। এই মর্মান্তিক ঘটনাটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির জ্বালানি খাতে কর্মরত শ্রমিকদের মধ্যে ব্যাপক শোক ও আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে।

হামলার বিবরণ ও ক্ষয়ক্ষতির চিত্র

ইউক্রেনের জ্বালানিমন্ত্রী ডেনিস শেমহাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টেলিগ্রামে দেওয়া এক বিবৃতিতে এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি জানান, তেরনিভস্কা শহরে খনি থেকে কাজ শেষে ফেরার পথে শ্রমিকদের লক্ষ্য করে এই ‘সন্ত্রাসী’ হামলা চালানো হয়। রাশিয়ার ছোঁড়া আত্মঘাতী ড্রোনটি সরাসরি শ্রমিকবাহী বাসটিকে আঘাত করলে ঘটনাস্থলেই ১২ জনের মৃত্যু হয়। এছাড়া এই ঘটনায় আরও অন্তত সাতজন গুরুতর আহত হয়েছেন, যাদের নিকটস্থ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

ইউক্রেনের বৃহত্তম বেসরকারি জ্বালানি প্রতিষ্ঠান ডিটিইকে (DTEK) নিশ্চিত করেছে যে, হতাহতরা সবাই তাদের প্রতিষ্ঠানের কর্মী ছিলেন। স্থানীয় পুলিশের পক্ষ থেকে প্রকাশিত একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, বিস্ফোরণের তীব্রতায় শ্রমিকদের বহনকারী বাসটি দুমড়ে-মুচড়ে সড়কের পাশে উল্টে পড়ে আছে এবং সেখান থেকে কালো ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছে।

নিচে দিনিপ্রোপেত্রোভস্ক ও এর আশপাশের অঞ্চলে সাম্প্রতিক হামলার ক্ষয়ক্ষতির একটি তালিকা প্রদান করা হলো:

হামলার স্থানলক্ষ্যবস্তুহতাহতের সংখ্যাক্ষয়ক্ষতির ধরন
তেরনিভস্কা (দিনিপ্রো)শ্রমিকবাহী বাস (ডিটিইকে)১২ নিহত, ৭ আহতযানচলাচলকারী বাস সম্পূর্ণ ধ্বংস।
জাপোরিঝিয়া শহরমাতৃসদন হাসপাতাল৯ আহত (প্রাথমিক)চিকিৎসাসেবা ব্যাহত ও ভবনের ক্ষতি।
জাপোরিঝিয়াআবাসিক ভবনআহতের সংখ্যা অজ্ঞাতবেসামরিক বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত।
সারাদেশেবিদ্যুৎ গ্রিড ও অবকাঠামোব্যাপকবিদ্যুৎ বিপর্যয় ও শীতে জনভোগান্তি।

আলোচনার প্রাক্কালে হামলার তীব্রতা

বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই হামলাটি এমন এক সময়ে সংঘটিত হয়েছে যখন আন্তর্জাতিক মহলে যুদ্ধবিরতির জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা তুঙ্গে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, আগামী বুধ ও বৃহস্পতিবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং ইউক্রেনের প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের ত্রিপক্ষীয় আলোচনা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আলোচনার ঠিক আগ মুহূর্তে এই ধরনের প্রাণঘাতী হামলাকে রাশিয়ার পক্ষ থেকে ‘মনস্তাত্ত্বিক চাপ’ হিসেবে দেখছেন অনেক বিশ্লেষক।

জ্বালানি খাতের ওপর উপর্যুপরি আঘাত

দীর্ঘ চার বছরের এই যুদ্ধে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোকে বিশেষভাবে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে রাশিয়া। শীতকালকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে রাশিয়ার সামরিক বাহিনী ইউক্রেনের বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও বিতরণ লাইনগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা অব্যাহত রেখেছে। এর ফলে দেশটির সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছে। দিনিপ্রোর এই হামলা প্রমাণ করে যে, রাশিয়ার সামরিক কৌশল এখন কেবল ফ্রন্টলাইনে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তারা যুদ্ধক্ষেত্রের পেছনের কারিগর তথা জ্বালানি শ্রমিকদেরও লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে।

ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসন কিয়েভকে দ্রুত একটি সম্মানজনক চুক্তিতে আসার জন্য চাপ দিচ্ছে। তবে জেলেনস্কি প্রশাসন বারবারই বলে আসছে যে, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা বজায় না রেখে কোনো শর্তে তারা রাশিয়ার সাথে আপোস করবে না। আবুধাবির আসন্ন বৈঠকটি যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে কি না, তা এখন বৈশ্বিক রাজনীতির প্রধান আলোচনার বিষয়। তবে তেরনিভস্কার মতো নৃশংস ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে বসার আগে মাঠ পর্যায়ে যুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ নেই।