দক্ষিণ আমেরিকার অর্থনৈতিক রূপান্তরের দেশ আর্জেন্টিনা বর্তমানে তীব্র মন্দার মধ্যে দাড়িয়ে আছে। দেশটির নাগরিকরা এমন এক অবস্থার মুখোমুখি হয়েছেন, যেখানে মৌলিক চাহিদা যেমন খাদ্য ও বিদ্যুৎ সামলাতে তাঁদের ক্রেডিট কার্ড বা ছোট ঋণের আশ্রয় নিতে হচ্ছে। সাম্প্রতিক জরিপ ও সরকারি তথ্য অনুসারে, দেশটির জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি মানুষ তাদের সঞ্চয় খালাস, জিনিসপত্র বিক্রি বা ঋণের ওপর নির্ভর করছেন।
বুয়েনোস আইরেসের উপকণ্ঠ ফ্লোরেন্সিও ভারেলা-এর একটি হার্ডওয়্যার স্টোরে ৪৩ বছর বয়সী ডিয়েগো নাকাসিও বলেন, “আমাদের মাসের বেতন ১৫ তারিখের আশেপাশেই শেষ হয়ে যায়। এরপর থেকে অতিরিক্ত কাজ খোঁজা, ঘরের জিনিসপত্র বিক্রি, ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার ও ছোট ঋণ নেওয়াই একমাত্র সমাধান।” তিনি যোগ করেন, “গত ২৫ বছর ধরে কঠোর পরিশ্রম করেছি—একটি ঘর বানিয়েছি, গাড়ি কিনেছি, এবং ১৭ বছরের ছেলে বড় করেছি। কিন্তু এখন, আগের চেয়ে ভালো চাকরি থাকলেও পুরো মাসের খাবারই নিজস্ব অর্থে ক্রয় করা সম্ভব হচ্ছে না।”
আর্জেন্টিনা গ্র্যান্ড ইনস্টিটিউটের সমাজবিজ্ঞানী ভিওলেটা কারেরা পেরেয়রা উল্লেখ করেন, “অর্থনৈতিক চাপ এতটাই গভীর যে, এমনকি যারা একাধিক চাকরি করছেন, তারা ঘর, গাড়ি বা জিনিসপত্রের জন্য নয়, শুধু খাবার কেনার জন্য ঋণ নিচ্ছেন।”
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশের সুপারমার্কেটের প্রায় অর্ধেক কেনাকাটা ক্রেডিট কার্ডে করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ঋণখেলাপির হার বৃদ্ধি পেয়েছে—ব্যক্তিগত ঋণের প্রায় ১১ শতাংশ এখনও মুলতুবি, যা ২০১০ সালের পর সর্বোচ্চ।
প্রেসিডেন্ট জাভিয়ের মিলেই ২০২৩ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর দাবি করেছেন, তার নীতি অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করেছে এবং দারিদ্র্য কমিয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও তার পরিকল্পনার সমর্থন দিয়েছে। তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। নভেম্বরে ২০২৫-এ ব্যাংকিং ও কৃষি খাত কিছুটা বেড়েছে, কিন্তু উৎপাদন ও বাণিজ্য খাতের বড় পতন দেখা গেছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বেড়ে সাধারণ মানুষের ব্যয় বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা খাদ্যের চাহিদা হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
গ্রিসেল্ডা কুইপিলডর, ৪৯ বছর বয়সী এক গৃহিণী, স্বামী, দুই মেয়ে ও দুই নাতি-নাতনির সঙ্গে থাকেন। তিনি জানান, “পরিবারে সবাই কাজ করলেও ১৮ তারিখের মধ্যে আমাদের অর্থ শেষ হয়ে যায়। মাসের শুরুতে ঋণ ও বিল পরিশোধ করি, তারপর আবার ঋণ নিতে হয়। এটি একটি ভাঙা কঠিন চক্র।”
আর্জেন্টিনার অর্থনৈতিক চিত্র (২০২৫)
| খাত | প্রবৃদ্ধি/পরিস্থিতি | মন্তব্য |
|---|---|---|
| ব্যাংকিং | +৪.২% | ঋণের প্রবাহ বাড়লেও ঋণখেলাপি বেড়েছে |
| কৃষি | +৩.৫% | খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে, তবে দামও বৃদ্ধি |
| উৎপাদন | -৫.০% | শিল্প উত্পাদন কমেছে |
| বাণিজ্য | -৪.৭% | রপ্তানি ও আমদানি উভয়ই হ্রাস পেয়েছে |
| বিদ্যুৎ ও জ্বালানি | +১৫-২০% ব্যয় | মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে |
| সুপারমার্কেট ক্রেডিট | ~৫০% ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার | ঋণবৃত্তি বৃদ্ধি |
এই পরিস্থিতি দেশের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। সাধারণ মানুষ ক্রমশ খাদ্য নিরাপত্তা ও দৈনন্দিন খরচ মেটাতে ঋণের ওপর নির্ভরশীল হচ্ছেন, যা আর্জেন্টিনার অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে আরও ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
