আয় ও ব্যয়ের অসামঞ্জস্যতায় কমছে মানুষের পারিবারিক ক্রয়ক্ষমতা

দেশের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক চিত্র—মানুষের আয়ের বৃদ্ধির হারের তুলনায় নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার গতি অনেক বেশি। ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে, যা সামগ্রিক জীবনযাত্রার মানকে নিম্নমুখী করছে। রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে ডিসেম্বর পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে বাজার পরিস্থিতি ও মজুরি হারের এক তুলনামূলক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হয়েছে।

মূল্যস্ফীতি বনাম মজুরি বৃদ্ধি: এক অসম লড়াই

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, গত বছরের শেষ প্রান্তিক থেকে মূল্যস্ফীতির হার ধারাবাহিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। ডিসেম্বরে সাধারণ মূল্যস্ফীতি যেখানে ৮ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, সেখানে মানুষের মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ১ শতাংশের নিচে স্থবির হয়ে আছে। এর অর্থ হলো, একজন মানুষের আয় যে হারে বাড়ছে, তার চেয়ে অনেক বেশি হারে বাড়ছে প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। অক্টোবর মাস থেকেই এই প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যেখানে মজুরি বৃদ্ধির হার কমতে শুরু করে এবং সেপ্টেম্বর থেকে তা ৮.১ শতাংশের নিচে নেমে আসে।

টেবিল: মূল্যস্ফীতি ও মজুরি বৃদ্ধির হারের তুলনামূলক চিত্র

মাস (২০২৫-২৬)মূল্যস্ফীতির হার (%)মজুরি বৃদ্ধির হার (%)ব্যবধান (গ্যাপ)
জুলাই৮.০ (গড়)৮.১৯+ ০.১৯
সেপ্টেম্বর৮.১২৮.১– ০.০২
অক্টোবর৮.১৭৮.০– ০.১৭
ডিসেম্বর৮.৫৮.০৮ (প্রায়)– ০.৪২
জানুয়ারি৮.৫+ (সামান্য বৃদ্ধি)অপরিবর্তিত– ০.৫০ (সম্ভাব্য)

বাজার ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা ও সরবরাহ সংকট

প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাজারে অনেক ক্ষেত্রে পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলেও ভোক্তা পর্যায়ে এর সুফল পৌঁছাচ্ছে না। পাইকারি বাজারের তুলনায় খুচরা বাজারে দামের আকাশচুম্বী ব্যবধান মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিচ্ছে। মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপট এবং বাজার তদারকির অভাবকে এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী করা হচ্ছে। সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক থাকলেও খুচরা বিক্রেতারা নানা অজুহাতে দাম কমিয়ে আনছে না, যা মূল্যস্ফীতিকে প্রত্যাশিত পর্যায়ে নামিয়ে আনার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ

বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণায় দেখা গেছে, নভেম্বরের পর থেকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের লাগামহীন দাম সাধারণ মানুষের পারিবারিক বাজেটকে তছনছ করে দিচ্ছে। এই সংকট নিরসনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার ব্যবস্থাপনায় কঠোর শৃঙ্খলা ফেরানোর ওপর জোর দিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পারিবারিক ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের জন্য কেবল আর্থিক নীতি নয়, বরং টেকসই নীতিগত সতর্কতার (Sustainable Policy Vigilance) প্রয়োজন।

দীর্ঘমেয়াদে একটি স্থিতিশীল সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিবেশ বজায় রাখতে হলে মজুরি বৃদ্ধির হারকে মূল্যস্ফীতির হারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। অন্যথায় মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার ফলে বাজারে চাহিদাও কমে যেতে পারে, যা উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে বাজার সিন্ডিকেট দমন এবং খুচরা পর্যায়ে পণ্যের যৌক্তিক দাম নিশ্চিত করতে দ্রুত হস্তক্ষেপ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

পরিশেষে, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সাধারণ মানুষের পকেটের ওপর চাপ কমানোই এখন অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ। যদি সময়মতো বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না যায়, তবে মূল্যস্ফীতির এই প্রকোপ প্রান্তিক মানুষের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলতে পারে।