আমার স্বামীকে হত্যা করল কে, কী কারণে?

সাইফান আবদুল্লাহ এবার জুনে ১০ বছর পূর্ণ করবে। কিন্তু বাবার আকস্মিক মৃত্যু তার জীবনে এমন একটি শূন্যতা তৈরি করেছে যা কোনোভাবেই পূরণ হচ্ছে না। “বাবা ছাড়া ভালো লাগে না, বাবা কেন ফাঁকি দিল?”—বারবার এই প্রশ্নগুলো তার কণ্ঠে শোনা যায়। ছোট ভাই শাদমান সাফিন মাত্র ৩ বছর বয়সী; প্রতিনিয়ত সে মুঠোফোনে বাবার সঙ্গে কথা বলতে চায়, কিন্তু তার সেই আশা আর পূরণ হবে না।

সাইফান ও শাদমান হলো কৃষিবিদ মোহাম্মদ শহিদুল ইসলামের দুই সন্তান। ২৩ জানুয়ারি অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির লাশ হিসেবে শহীদুলের দেহ উদ্ধার করা হয়। এবারই তারা প্রথমবার ঈদ উদযাপন করবে বাবার অনুপস্থিতিতে। দাদা, নানা, চাচা ও মামারা যতটা সম্ভব উপহার দিয়েছেন, তবুও সাইফানের মন খারাপের জায়গা অন্য। বাবা থাকলে হয়তো ঈদের কেনাকাটার জন্য বাজারে নিয়ে যেতেন—এখন মা কেন নিয়ে যাচ্ছেন না, এই প্রশ্ন তার মনে ধ্বনিত হচ্ছে।

শহিদুল ইসলামের স্ত্রী শাম্মী আকতার বলেন, “ছেলেদের সঙ্গে ঈদের বাজার করতে পারছি না। তারা বোঝে না যে বাবা নেই। বড় ছেলে কিছুটা বোঝলেও মানতে পারছে না, চিৎকার–চেঁচামেচি করছে।”

নিখোঁজ থেকে মৃত্যুর রহস্য

শহিদুল ইসলাম ছিলেন আন্তর্জাতিক ভুট্টা ও গম গবেষণাকেন্দ্রের সাবেক রিসার্চ কো-অর্ডিনেটর। ২১ জানুয়ারি ঢাকার গুলশান থেকে বরিশাল ফেরার পথে তিনি নিখোঁজ হন। ২৩ জানুয়ারি মাদারীপুরের শিবচর থানার পুলিশ শিবচর মহাসড়কের ঢাল থেকে অজ্ঞাতনামা এক লাশ উদ্ধার করে, যা পরে শহীদুল ইসলামের পরিচয় নিশ্চিত হয়।

শহিদুলের কর্মস্থল ছিল বরিশালের আলেকান্দা এলাকা, যেখানে পরিবারসহ তিনি থাকতেন। প্রকল্প শেষ হওয়ায় তিনি নিজের গ্রামের বাড়িতে কৃষি খামার শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

ঘটনাতারিখ ও সময়স্থান/বিস্তারিত
ঢাকায় লেনদেন২০ জানুয়ারিমহাখালী, ছোট ভাই এরশাদের বাসা
ব্যাংক ভিজিট২১ জানুয়ারিগুলশান, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক
নিখোঁজ২১ জানুয়ারি দুপুর ১২টাঢাকার গুলশান থেকে
লাশ উদ্ধার২৩ জানুয়ারিশিবচর, ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের ঢাল

শহিদুলের ফোন ২১ জানুয়ারি দুপুর ১২:৩২ মিনিটে কেরানীগঞ্জের ইকুরিয়া এলাকায় সর্বশেষ ট্র্যাক করা হয়। এরপর থেকে তিনি নিখোঁজ।

তদন্ত ও রহস্য

মাদারীপুরের শিবচর থানায় ২৭ জানুয়ারি মতিউর রহমান অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। শাম্মী আকতার অভিযোগ করেন, “প্রথমে সন্দেহ করা হয়েছিল স্বামী হয়তো মলম বা অজ্ঞান পার্টির কবলে পড়েছেন। কিন্তু সময় গড়িয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সন্দেহ বাড়ছে।” সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী শহিদুলকে সর্বশেষ তুরাগ পরিবহনের বাসে ওঠা দেখা গেছে, এরপর আর কোনো তথ্য পুলিশ জানায়নি।

শিবচর থানার ওসি শফিকুল ইসলাম বলেন, “এখন পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। কিছু তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, তবে ভিসেরা প্রতিবেদন এখনও মেলেনি।”

শূন্যতায় শিশু ও স্ত্রী

শহিদুল ইসলামের স্ত্রী শাম্মী দুই ছেলেকে নিয়ে এখন পটুয়াখালীর শ্বশুরবাড়িতে রয়েছেন। বড় ছেলে চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি। শহিদুলের শুরু করা খামারের দায়িত্ব এখন শ্বশুর দেখছেন। শাম্মী জানান, চাকরিতে থাকা অবস্থায় শহিদুলের কোনো শত্রু ছিল না।

শাম্মী আকতার শেষবার বলেন, “এখন শুধু জানতে চাই—আমার স্বামীকে কে, কেন, কীভাবে মারল?”

এই ঘটনাটি শুধু একটি পরিবার নয়, বরিশালের এলাকার জন্যও এক গভীর রহস্য এবং শোকের ইতিহাস হয়ে দাঁড়িয়েছে।