আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং ধুঁকতে থাকা ব্যাংকগুলোকে পুনর্গঠন করতে এক কঠোর ও নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের ওপর আন্তর্জাতিক রীতি অনুযায়ী ‘হেয়ারকাট’ পদ্ধতি প্রয়োগ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই নির্দেশনার ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর প্রায় ৭৫ লক্ষ আমানতকারী ২০২৪ ও ২০২৫—এই দুই বছরের অর্জিত যাবতীয় মুনাফা হারাবেন। বুধবার ব্যাংকগুলোর প্রশাসকদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এই সিদ্ধান্ত অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যার ফলে আমানতকারীদের হিসাবে থাকা বর্তমান স্থিতির ওপর বড় ধরণের কাটছাঁট হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই পাঁচটি ব্যাংক গত দুই বছরে ভয়াবহ আর্থিক লোকসানের সম্মুখীন হয়েছে এবং বর্তমানে ব্যাংকগুলোতে ঋণের পরিমাণ আমানতের তুলনায় অনেক বেশি। ব্যাংকগুলোর মোট ১ লক্ষ ৯৩ হাজার কোটি টাকা ঋণের একটি বিশাল অংশ খেলাপি হয়ে যাওয়ায় আমানতকারীদের লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতা পুরোপুরি হারিয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলো। নতুন এই সিদ্ধান্তের আওতায় ১ জানুয়ারি ২০২৪ থেকে ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত সময়ে আমানতের ওপর কোনো মুনাফা বা লাভ বিবেচনা করা যাবে না এবং এই নির্দিষ্ট সময়ের স্থিতি অনুসারে আমানত পুনরায় গণনা করা হবে। এর ফলে গ্রাহকদের অ্যাকাউন্টে গত দুই বছরে যে ৭ থেকে ৯ শতাংশ হারে লভ্যাংশ যোগ হয়েছিল, তা পুরোপুরি বাতিল হয়ে যাবে এবং আমানতের চূড়ান্ত স্থিতি আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের আর্থিক চিত্র ও হেয়ারকাট তথ্য
| বিবরণ | বিস্তারিত পরিসংখ্যান |
| একীভূত হওয়া ব্যাংকসমূহ | ফার্স্ট সিকিউরিটি, গ্লোবাল ইসলামী, ইউনিয়ন, এক্সিম ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক |
| নতুন ব্যাংকের নাম | সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক |
| প্রভাবিত আমানতকারীর সংখ্যা | প্রায় ৭৫,০০০০ জন |
| মুনাফা বাতিলের সময়কাল | ১ জানুয়ারি ২০২৪ থেকে ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ |
| মোট আমানত ও ঋণের পরিমাণ | আমানত ১.৪২ লক্ষ কোটি টাকা; ঋণ ১.৯৩ লক্ষ কোটি টাকা |
| মালিকানা সংক্রান্ত তথ্য | এস আলম গ্রুপ ও নজরুল ইসলাম মজুমদার নিয়ন্ত্রিত ব্যাংক |
এই ব্যাংকগুলোর বিপর্যয়ের নেপথ্যে রয়েছে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বিগত সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী মহলের লাগামহীন লুটপাট। এক্সিম ব্যাংক ছিল বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে, আর বাকি চারটি ব্যাংকের মূল কলকাঠি নাড়তেন এস আলম গ্রুপের সাইফুল আলম। ক্ষমতার অপব্যবহার করে বেনামে হাজার হাজার কোটি টাকা বের করে নেওয়ার ফলে ব্যাংকগুলো দেউলিয়া হওয়ার পথে ছিল। ইতিমধ্যে এই পাঁচ ব্যাংকের শেয়ার মূল্য ‘শূন্য’ ঘোষণা করায় উদ্যোক্তা ও সাধারণ বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগ খুইয়েছেন। এখন ব্যাংকগুলোকে দেউলিয়া হওয়া থেকে বাঁচাতে এবং ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ নামে নতুনভাবে শুরু করতে সাধারণ আমানতকারীদের জমানো মুনাফার ওপর এই কঠোর ‘হেয়ারকাট’ কার্যকর করা হচ্ছে।
