ভয়ংকর হয়ে উঠেছে আবার ফিরে আসা সেই অ্যাডিনোভাইরাস
কলকাতা ও এর আশপাশের শহরগুলো তো অ্যাডিনোভাইরাসে আক্রান্ত শিশুদের পরিমান বাড়ছে। সব জেলার স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, শহরে মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠকে বসেন স্বাস্থ্যসচিব নারায়ণস্বরূপ নিগম।

২ বছর পর ফিরে আসা অ্যাডিনোভাইরাসের মিউটেশনের সাহায্যে জিনগত কোনো সংশোধন ঘটেছে কী না, ইতোমধ্যেই তা জানার চেষ্টা করছে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কলেরা অ্যান্ড এন্টেরিক ডিজিজেস (নাইসেড)। জানা যায়, রাজ্যের বিভিন্ন চিকিৎসালয় থেকে সারাবছর নাইসেডে পাঠানো নমুনা এক্সামের মাধ্যমে শ্বাসযন্ত্রে সংক্রমণের (রেসপিরেটরি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন) ওপরে পর্যবেক্ষণ চালানো হয়। এ নিয়ে তারা এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

প্রতাশিত প্রতিবেদনে উঠে আসে উদ্বেগের ছবি। জানা যায়, ডিসেম্বরে এ আক্রান্তের হার ছিল ২২ শতাংশ, জানুয়ারিতে ছিল ৩০ শতাংশ এবং ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পরীক্ষা করে লক্ষ্য গেছে তা ৩০ শতাংশের বেশি।
নাইসেডের মুখপাত্র শান্তা দত্ত বলেন, এ রাজ্যে আকস্মিক অ্যাডিনোভাইরাসের প্রকোপ কেন, সেটি বোঝা যাচ্ছে না। নানারকম হাসপাতাল হতে ফোন আসছে। ব্যাপারটা জানতে ভাইরাসটির জিনোম সিকোয়েন্স করা হচ্ছে।
সাধারণ শয্যা ছাড়াও পেডিয়াট্রিক ইন্টেনসিভ কেয়ার ইউনিটে দিন দিন রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এই ইউনিটে এক হতে দুই বছরের শিশুর সংখ্যা বেশি। এক বৈঠকে বলা হয়, রাজ্যে করোনার সময়ে শিশুদের চিকিৎসার জন্য যে পরিকাঠামো তৈরি করে তোলা হয়েছিল তা যেন পুরোপুরি কাজে লাগানো হয় সে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। অযথা যেন কোন শিশুকে রেফার করে শহরের হাসপাতালগুলোতে চাপ তৈরি করা না হয়। প্রতিদিনই নমুনা পাঠাতে হবে বিদ্যালয় অব ট্রপিক্যাল মেডিসিনে।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তা সিদ্ধার্থ নিয়োগী বলেন, অ্যাডিনোভাইরাসে আক্রান্তদের চিকিৎসায় কী করণীয়, অবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে সে বিষয়ে আবারও আলোচনা হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কলকাতার বি সি রায় শিশু হাসপাতালেও রোগীর পরিমান ক্রমশ বাড়ছে। খোলা হয়ে গিয়েছে ফিভার ক্লিনিক। যদিও সেই ডাক্তারখানা চত্বরে সংবাদমাধ্যমের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছেন সেখানকার রোগীকল্যাণ সমিতির চেয়ারম্যান, সাংসদ কাকলি ঘোষদস্তিদার। তিনি বলেন, অযথা শঙ্কিত হওয়ার কোনও দরকার নেই। যদিও অ্যাডিনোভাইরাস ইতোমধ্যেই কোভিড পরবর্তী নিউ আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে বলেই মত অধিকাংশ চিকিৎসকের।
তবে বয়স্কেদেরও আক্রান্ত হওয়ার পরিমান কম নয়। তাদের শ্বাসনালির উপরিভাগ বেশি সংক্রমিত হচ্ছে। তারা জ্বর ও দীর্ঘ দিন ধরে কাশিতে ভুগছেন।
শহরের এক হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ বলেন, ২ বর্ষের কম বয়সি বাচ্চাদের অতি ফাস্ট রেসপিরেটরি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন হচ্ছে। অনেকের শারীরিক সিচুয়েশন এত দ্রুত খারাপ হলো যে, ভেন্টিলেশন অথবা অন্যান্য মানব নির্মিত উপায়ে রোগীকে বাঁচিয়ে রাখতে হচ্ছে। শহরের এক বেসরকারি হাসপাতালের শিশুরোগ ডাক্তার শান্তনু রায়ের মতে, মিউটেশনের কারণেই অ্যাডিনোভাইরাস এত বেশি সংক্রামক ও ভয়ানক বলে মনে হচ্ছে। প্রথমে এই ভাইরাসে ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা অধিক পাওয়া যেত না। এ বার সেটা গুরুতর বেশি। মেনিনজাইটিসও হচ্ছে।
ভাইরোলজিস্ট সিদ্ধার্থ জোয়ারদার বলেন, রাজ্যের অধিকাংশ মানুষ কোভিশিল্ড নিয়েছেন। এর মাধ্যমে শিম্পাঞ্জির মডিফায়েড (পরিবর্তিত) অ্যাডিনোভাইরাস ‘ভেক্টর ভাইরাস’ মানবশরীরে প্রবেশ করেছে। রেপ্লিকেট (বিভাজিত হয়ে পরিমান বৃদ্ধি) করার জন্য অপারগ এই ম্যালওয়্যার কোষের মধ্যে থেকে করোনাভাইরাসের স্পাইক আমিষ তৈরিতে নিয়োজিত থাকার কথা। সিদ্ধার্থ বলেন, অধুনা মানবশরীরে এই মডিফায়েড ভাইরাস বিদ্যমান কী না, থাকলেও সর্দি-কাশি সৃষ্টি করে, এইরকম অ্যাডিনোভাইরাসের সাথে সম্পর্ক কী, তা নিয়ে তত্ত্বানুসন্ধান প্রয়োজন। কাজটা দৃঢ় হলেও জিনোম সিকোয়েন্সের দ্বারাই উত্তর পাওয়া যেতে পারে।
