১৯৭২ সালে অ্যাপোলো ১৭ মিশনের কমান্ডার ইউজিন সারনান চাঁদের বুক থেকে বিদায় নেওয়ার সময় বলেছিলেন, “আমি যখন চাঁদের শেষ পদচিহ্ন এঁকে বাড়ির পথে রওনা দিচ্ছি, আমি বিশ্বাস করি, এটি খুব বেশি সময়ের জন্য নয়।” তখন তাঁর কণ্ঠে ছিল ফিরে আসার আশা। তবে ইতিহাস অন্যভাবে এগিয়েছে। পাঁচ দশকের বেশি সময় পার হলেও মানুষ এখনও পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথের বাইরে কোনো স্থানে পৌঁছায়নি।
অবশেষে সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে। নাসার আর্টেমিস–২ মিশনের মাধ্যমে চার নভোচারী আবারও চাঁদের পথে পাড়ি দেবেন। তবে অভিযানের সূচনাকে বেশ কয়েকবার ধাক্কা লেগেছে। শুরুতে আশা করা হয়েছিল, মার্চ ২০২৬-এ রকেট উৎক্ষেপণ হবে। কিন্তু শেষ মুহূর্তের কারিগরি ত্রুটির কারণে নাসা দ্বিতীয়বারের মতো অভিযান স্থগিত করেছে।
নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান জানিয়েছেন, মার্চের মধ্যে আর কোনো উৎক্ষেপণের সম্ভাবনা নেই। ফলে রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কোচ ও জেরেমি হ্যানসেনের চার সদস্যের দল অন্তত ১ এপ্রিল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। ২০২৭ সালের মধ্যে চাঁদে অবতরণের জন্য নাসা ইতিমধ্যেই স্পেসএক্স-এর সঙ্গে ২৯০ কোটি ডলারের চুক্তি করেছে। তবে এসএলএস রকেটের বারবার বিলম্ব পুরো আর্টেমিস প্রোগ্রামকেই অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে।
বর্তমানে মেক্সিকোর হিউস্টনে কোয়ারেন্টিনে থাকা চার মহাকাশচারী কবে পৃথিবী ছাড়বেন তা অনিশ্চিত। আইজ্যাকম্যান বলেন, “মানুষ হতাশ হতে পারে, তবে নাসার দল যারা দিন-রাত কাজ করছে, তাদের চেয়ে বেশি হতাশ আর কেউ নেই।”
আর্টেমিস–২ একটি ১০ দিনের গভীর মহাকাশ অভিযান। এটি নতুন মহাকাশযান, নতুন অংশীদারিত্ব ও চন্দ্রাভিযানের নতুন যুগের সূচনা করবে। অ্যাপোলো যুগের সমাপ্তি হয়েছিল রাজনীতি, বিজ্ঞান ও উচ্চ খরচের কারণে। তখন বিজ্ঞানীরা চাঁদকে শুষ্ক ও মৃত মনে করতেন। ২০০৮ সালে ভারতের চন্দ্রযান–১ অভিযানের মাধ্যমে চাঁদে পানির অস্তিত্ব নিশ্চিত হওয়ার পর পরিকল্পনা বদলে গেছে। বিশেষ করে চাঁদের দক্ষিণ মেরুর বরফের অস্তিত্ব দীর্ঘমেয়াদি মানব বসতি গড়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে।
আর্টেমিস–২-এ কোনো চন্দ্র অবতরণ হবে না; এটি চাঁদকে প্রদক্ষিণ করে ফিরে আসবে। তবে চার নভোচারী ইতিহাসে নতুন রেকর্ড গড়বেন:
| নাম | দেশ/সংস্থা | বিশেষত্ব |
|---|---|---|
| রিড ওয়াইজম্যান | মার্কিন নৌবাহিনী | কমান্ডার |
| ভিক্টর গ্লোভার | মার্কিন নৌবাহিনী | প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ পাইলট চাঁদে |
| ক্রিস্টিনা কোচ | নাসা | প্রথম নারী চন্দ্র অভিযানে, মহাকাশে দীর্ঘতম সময় |
| জেরেমি হ্যানসেন | কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সি | যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে প্রথম নাগরিক চাঁদে |
নভোচারীরা এসএলএস রকেট ও ওরিয়ন মহাকাশযানে করে যাত্রা করবেন। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে মানববাহী চন্দ্র অবতরণের মহড়া হবে। মিশনে করা হবে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা, যেমন আরচার: গভীর মহাকাশে ঘুম, মানসিক চাপ ও পারস্পরিক সমন্বয়; ভ্যান অ্যালেন বেল্টের বাইরে তেজস্ক্রিয়তার প্রভাব; এবং অর্গান-অন-এ-চিপ প্রযুক্তি ব্যবহার।
অ্যাপোলোর তুলনায় আর্টেমিস প্রযুক্তি বহুগুণ উন্নত। ওরিয়ন কমান্ড মডিউল অ্যাপোলোর চেয়ে ৩০% প্রশস্ত, সৌর প্যানেল ব্যবহার করে, এবং কম্পিউটার প্রসেসিং ক্ষমতা শতগুণ বেশি। যদিও কিছু যান্ত্রিক ত্রুটি মিশন বিলম্বিত করেছে, তবুও মানুষ আবার চাঁদের পথে যাচ্ছেন। এবার তারা সেখানে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানের প্রস্তুতি নিয়েই রওনা দিচ্ছেন।
