বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে ধারাবাহিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন, রপ্তানি বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রবাসী আয়ের প্রবাহের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলেছে। তবে এই উন্নয়নের পেছনে একটি দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যা ক্রমশ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে—দেশের আর্থিক প্রবাহ ও বিনিয়োগ কার্যক্রম অত্যন্ত সীমিত কিছু নগরকেন্দ্র, বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যেই কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংক–এর ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনের (অক্টোবর–ডিসেম্বর ২০২৫) বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশে মোট আমানতের পরিমাণ প্রায় ২০,০৫,৩৩৮ কোটি টাকা এবং মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭,৭৭,৩১৬ কোটি টাকায়। এই বিপুল আর্থিক প্রবাহ দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রতিফলন হলেও এর ভৌগোলিক বণ্টন গভীর অসমতার চিত্র তুলে ধরে।
Table of Contents
নগর–গ্রাম বৈষম্য
দেশের ব্যাংকিং কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মোট আমানতের প্রায় ৮৪ শতাংশই শহরাঞ্চলে কেন্দ্রীভূত, যেখানে গ্রামীণ এলাকার অংশ মাত্র ১৬ শতাংশ। ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে বৈষম্য আরও তীব্র—প্রায় ৯২ শতাংশ ঋণ শহরকেন্দ্রিক এবং মাত্র ৭–৮ শতাংশ গ্রামীণ অর্থনীতিতে পৌঁছায়। এর ফলে গ্রামীণ উদ্যোক্তা, কৃষিভিত্তিক শিল্প এবং ক্ষুদ্র ব্যবসা পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
বিভাগভিত্তিক আর্থিক বণ্টন
দেশের বিভাগভিত্তিক তথ্য আরও স্পষ্টভাবে ঢাকাকেন্দ্রিক অর্থনীতির চিত্র তুলে ধরে।
| বিভাগ | আমানত (%) | ঋণ (%) |
|---|---|---|
| ঢাকা | 60.32 | 67.34 |
| চট্টগ্রাম | 21.36 | 19.40 |
| খুলনা | 4.41 | 3.74 |
| রাজশাহী | 4.18 | 3.72 |
| সিলেট | 4.00 | 1.07 |
| বরিশাল | 2.02 | 1.10 |
| রংপুর | 2.03 | 2.30 |
| ময়মনসিংহ | 1.68 | 1.33 |
এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট যে, ঢাকা বিভাগ একাই দেশের মোট আমানতের ৬০ শতাংশের বেশি এবং ঋণের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। চট্টগ্রাম দ্বিতীয় অবস্থানে থাকলেও তার সঙ্গে ঢাকার ব্যবধান অত্যন্ত বড়। অন্যদিকে সিলেট, বরিশাল, রংপুর ও ময়মনসিংহ এখনো তুলনামূলকভাবে অনেক পিছিয়ে রয়েছে।
বৈষম্যের মূল কারণ
এই অসমতার পেছনে বেশ কিছু কাঠামোগত কারণ বিদ্যমান। শিল্প ও কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশই ঢাকা ও আশপাশে অবস্থিত হওয়ায় অর্থনৈতিক কার্যক্রম সেখানেই কেন্দ্রীভূত হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বড় অংশও এই অঞ্চলে সীমাবদ্ধ। পাশাপাশি উন্নত অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং দক্ষ মানবসম্পদের সহজলভ্যতা বড় শহরগুলোকেই বিনিয়োগের প্রধান গন্তব্যে পরিণত করেছে।
সম্ভাব্য ঝুঁকি
এই বৈষম্য দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির জন্য বেশ কিছু ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। গ্রামীণ অর্থনীতির দুর্বলতা, অতিরিক্ত নগরায়ণ, শহরে যানজট ও পরিবেশ দূষণ বৃদ্ধি, এবং অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ—সবই এর প্রত্যক্ষ ফল। একই সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের কৃষি, প্রাকৃতিক সম্পদ ও মানবসম্পদের পূর্ণ ব্যবহার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
নীতিগত করণীয়
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিকেন্দ্রীকরণ এখন সময়ের দাবি। বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ সম্প্রসারণ, ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের বিস্তার, এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা জরুরি। পাশাপাশি প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সেবাকে রাজধানীর বাইরে ছড়িয়ে দেওয়া হলে আঞ্চলিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে অগ্রসর হলেও এর ভৌগোলিক বৈষম্য এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের জন্য দেশের প্রতিটি অঞ্চলে সমান অর্থনৈতিক সুযোগ নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
