আজ, ২৮ ফেব্রুয়ারি, বাংলাদেশের পপ সঙ্গীতের অগ্রদূত ও কিংবদন্তি শিল্পী আজম খানের জন্মবার্ষিকী। তিনি কেবল পপ সঙ্গীতের পথপ্রদর্শক ছিলেন না, বরং সাধারণ মানুষের হৃদয়ও তিনি ছুঁয়ে গেছেন। তার সঙ্গীত শুধুমাত্র বিনোদনের সীমা ছাড়িয়ে একটি সাংস্কৃতিক প্রতীক হয়ে উঠেছিল, যা বাংলাদেশের দৈনন্দিন জীবন ও মানুষের আবেগের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
Table of Contents
শৈশব ও প্রাথমিক প্রভাব
আজম খান তার শৈশব কাটিয়েছেন আজিমপুর এবং কামালপুরে। তিনি ছোটবেলায় ভাষা আন্দোলনের উচ্ছ্বাস প্রত্যক্ষ করেছেন, যেখানে মানুষ মাতৃভাষার অধিকার আদায়ে জোরে চিৎকার করতো। সেই অভিজ্ঞতা তার চিন্তাধারাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। স্কুল জীবনেই তিনি বন্ধুদের সঙ্গে গান গাইতেন এবং প্রিয় গানের সুর নিখুঁতভাবে অনুকরণ করতেন। নিজেই পরে বলেছিলেন, “আমি গানের প্রতিটি সুর সঠিকভাবে অনুকরণ করতে পারতাম, মানুষ তা অবিশ্বাস্য মনে করতো।”
বিপ্লবী চেতনা ও লোকসঙ্গীত
নবম শ্রেণীতে পড়ার সময় তিনি পাকিস্তানি শাসকের অবিচার ও দেশের সাধারণ মানুষের শোষণ দেখে বিপ্লবী চেতনায় উদ্ভাসিত হন। তিনি “ক্রীান্তি আর্টিস্টস গ্রুপ”-এ যোগ দেন এবং লোকসঙ্গীতের মাধ্যমে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে অংশ নেন। ঢাকার বাইরে পারফরম্যান্সে পুলিশী হামলা সহ্য করেও তিনি জনগণের মধ্যে সামাজিক সচেতনতা ছড়িয়ে দিতেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তার সঙ্গীত স্বাধীনতার আন্দোলনে জনগণকে প্রেরণা জুগিয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ
মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই আজম খান সাহসী সিদ্ধান্ত নেন। তিনি দুই বন্ধুর সঙ্গে ভারতে গিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণ নেন। মুক্তিকামী ছেলেরূপে তার গান যুদ্ধের অঙ্গীকার ও উদ্দীপনা ছড়িয়েছে।
স্বাধীনতার পর পপ সঙ্গীত
মুক্তিযুদ্ধের পর দেশে ফিরে আজম খান পপ সঙ্গীতে প্রবেশ করেন। দ্য বিটলস, দ্য শ্যাডোজ এবং দ্য রোলিং স্টোনসের প্রভাব তাকে এবং তার বন্ধুদের নতুন সুর এবং পারফরম্যান্সের পথ দেখায়। সমাজের অবহেলিত মানুষের কষ্টকে তুলে ধরা তার গান দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
উল্লেখযোগ্য গান ও তাৎপর্য
| গান শিরোনাম | তাৎপর্য |
|---|---|
| রেল লাইনের ওই বস্তিতে | সাধারণ মানুষের জীবনচিত্র উপস্থাপন |
| হাই কোর্টের মাজারে | সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি |
| এতো সুন্দর দুনিয়ায় | প্রেম ও সৌন্দর্যের উদযাপন |
| অভিমানি | ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রকাশ |
| অনামিকা | যুবসমাজের প্রিয় গান |
| পাপড়ি | সামাজিক গল্পকথা |
| আলাল ও দুলাল | হাস্যরস ও দৈনন্দিন জীবন |
| আছি আছি বলে তুমি আর এলে না | ক্ষতি ও বঞ্চনার অনুভূতি |
| আমি জারে ছাইরে | দেশপ্রেম ও বন্ধুত্ব |
| জ্বালা জ্বালা | বিপ্লবী ও প্রেরণামূলক গান |
| ও চাঁদ সুন্দর | প্রেমের সূক্ষ্মতা |
| ও রে সালেকা ও রে মালেকা | সামাজিক সচেতনতা |
শেষ সময় ও অমর প্রভাব
২৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৫০ সালে জন্ম নেওয়া আজম খান ৫ জুন ২০১১ সালে দীর্ঘকালের ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে পরলোকে পাড়ি দেন। শারীরিকভাবে তিনি আর নেই, তবে তার সঙ্গীত আজও প্রাসঙ্গিক, প্রেরণাদায়ক এবং বাংলাদেশের পপ সঙ্গীতের অমূল্য উত্তরাধিকার।
আজম খানের জীবন ও শিল্পীজীবন আমাদের শেখায় যে একজন সঙ্গীতশিল্পী কেবল পারফর্মার নয়—তাঁরা জাতীয় সাংস্কৃতিক চেতনাকে বহন করতে পারেন। তার গান প্রজন্মের পর প্রজন্মকে দেশপ্রেম, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং সঙ্গীতের প্রতি ভালোবাসা জাগিয়ে রাখবে।
