আচার্য দীনেশচন্দ্র সেন: বাংলা সাহিত্যের অমর দিকপাল

আচার্য ড. দীনেশচন্দ্র সেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি ছিলেন একজন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, গবেষক, ইতিহাসবিদ এবং লোকসাহিত্যবিশারদ। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস ও লোকসাহিত্যের চর্চায় তাঁর অবদান অনন্য। ১৯২১ সালে ভারত সরকার তাঁকে ‘রায় বাহাদুর’ উপাধিতে ভূষিত করে সম্মানিত করে।

জন্ম ও পরিবার:

১৮৬৬ সালের ৩ নভেম্বর মানিকগঞ্জ জেলার বগজুরি গ্রামে তাঁর জন্ম। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল ঢাকা জেলার সুয়াপুর গ্রামে। পিতা ঈশ্বরচন্দ্র সেন ছিলেন মানিকগঞ্জ আদালতের একজন উকিল এবং মাতা রূপলতা দেবী ছিলেন গুণী ও শিক্ষানুরাগী।

শিক্ষাজীবন:

ড. দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর শিক্ষা জীবন শুরু করেন জগন্নাথ স্কুল থেকে, যেখানে ১৮৮২ সালে তিনি এন্ট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরে ঢাকা কলেজ থেকে ১৮৮৫ সালে এফএ এবং ১৮৮৯ সালে বিএ পাস করেন। ছাত্রজীবন থেকেই সাহিত্য ও ইতিহাসের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল।

কর্মজীবন ও গবেষণা:

১৮৮৭ সালে সিলেটের হবিগঞ্জ স্কুলে শিক্ষকতা দিয়ে তাঁর কর্মজীবনের সূচনা হয়। পরবর্তীতে তিনি কুমিল্লার শম্ভুনাথ ইনস্টিটিউশন (১৮৮৯) এবং ভিক্টোরিয়া স্কুলের (১৮৯০) প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়েই তিনি গ্রামবাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে প্রাচীন পুঁথি সংগ্রহ করেন। ১৮৯৬ সালে তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্য’ প্রকাশ করেন, যা বাংলা সাহিত্য ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হয়ে ওঠে।

সাহিত্যচর্চার শিখরে:

১৯১১ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর বিশ্বখ্যাত ‘History of Bengali Literature’, যা তাঁকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও প্রতিষ্ঠিত করে। ১৯১৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে রামতনু লাহিড়ী রিসার্চ ফেলোশিপ প্রদান করে, যার আওতায় তিনি ময়মনসিংহ গীতিকা ও পূর্ববঙ্গ গীতিকা সম্পাদনা করেন।

ড. দীনেশচন্দ্র সেন পরবর্তীতে আরও অসংখ্য সম্মাননা লাভ করেন—

  • ১৯২১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি.লিট ডিগ্রি

  • ১৯৩১ সালে জগত্তারিণী স্বর্ণপদক

১৯২৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁর সম্পাদিত ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’ প্রকাশিত হয়। তাঁর বিশাল গবেষণাকর্ম ‘বৃহৎবঙ্গ’ বাঙালির ইতিহাসচর্চায় এক অমূল্য সংযোজন।

মৃত্যু:

১৯৩৯ সালের ২০ নভেম্বর কলকাতার বেহালায় এই মহামানবের জীবনাবসান ঘটে। তাঁর গবেষণা, সাহিত্যচর্চা এবং অধ্যবসায়ের উত্তরাধিকার বাংলা সাহিত্যে আজও একটি আলোকবর্তিকার মতো জ্বলজ্বল করছে।

লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক, গণমাধ্যম।