ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিমান শক্তি উল্লেখযোগ্য চাপের মুখে পড়েছে। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ ও বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদনের সমন্বিত মূল্যায়নে দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ১৬টির বেশি বিমান নিশ্চিতভাবে ধ্বংস বা ভূপাতিত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তসহ মোট সংখ্যাটি ২০-এর কাছাকাছি বা তারও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সংঘর্ষে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে উল্লেখযোগ্য ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। একটি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমান ইরানের আকাশসীমার ভেতরে ভূপাতিত হওয়ার ঘটনা নিশ্চিত হয়েছে। এতে থাকা দুই ক্রুর একজনকে উদ্ধার করা গেলেও অন্যজন নিখোঁজ রয়েছেন, যা পরিস্থিতির জটিলতাকে আরও স্পষ্ট করে। একই সময়ে একটি এ-১০ থান্ডারবোল্ট-২ আক্রমণ বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। উদ্ধার অভিযানে পাঠানো হেলিকপ্টারও হামলার মুখে পড়ায় যুদ্ধক্ষেত্রের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়েছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
এই সংঘাতে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন খাতে। বিশেষ করে নজরদারি ও নির্ভুল হামলার জন্য ব্যবহৃত এমকিউ-৯ রিপার ড্রোনের অন্তত ১০টির বেশি ভূপাতিত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। কিছু প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণে এই সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ইঙ্গিত করা হয়েছে। তুলনামূলক ধীরগতির এবং পূর্বনির্ধারিত ফ্লাইট প্যাটার্ন অনুসরণ করার কারণে এই ড্রোনগুলো সহজেই প্রতিপক্ষের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে।
এছাড়া যুদ্ধবিমানের ক্ষতির ক্ষেত্রেও উদ্বেগ বাড়ছে। একাধিক এফ-১৫ শ্রেণির বিমান হারানোর পাশাপাশি যুদ্ধের শুরুতে ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’ বা মিত্রপক্ষের ভুল আঘাতে কয়েকটি বিমান ধ্বংস হওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে, যা অপারেশনাল সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। একটি কেসি-১৩৫ স্ট্র্যাটোট্যাঙ্কার রিফুয়েলিং বিমান দুর্ঘটনায় ধ্বংস হওয়ায় দীর্ঘসময় আকাশে অপারেশন চালানোর সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নিচে সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ক্ষয়ক্ষতির একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হলো—
| বিমান/ড্রোনের ধরন | সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি | আনুমানিক একক মূল্য |
|---|---|---|
| এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন | ১০+ ভূপাতিত | প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডলার |
| এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল | ১+ ধ্বংস | ৮০–১০০ মিলিয়ন ডলার |
| এ-১০ থান্ডারবোল্ট-২ | ১ বিধ্বস্ত | প্রায় ২০ মিলিয়ন ডলার |
| কেসি-১৩৫ ট্যাঙ্কার | ১ ধ্বংস | উচ্চমূল্যের কৌশলগত সম্পদ |
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ক্ষয়ক্ষতির পেছনে ইরানের বহুমাত্রিক প্রতিরক্ষা কৌশল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। উন্নত সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল (এসএএম) ব্যবস্থা, মোবাইল এয়ার ডিফেন্স ইউনিট এবং ইলেকট্রনিক জ্যামিং প্রযুক্তির সমন্বিত ব্যবহারে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন ও নিম্ন-উচ্চতায় উড়তে থাকা বিমানগুলোকে কার্যকরভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হচ্ছে।
এই ক্ষতির প্রভাব শুধু অর্থনৈতিক নয়, কৌশলগত দিক থেকেও গভীর। প্রতিটি ড্রোন বা যুদ্ধবিমান হারানো মানে নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং নির্ভুল হামলার সক্ষমতায় ঘাটতি তৈরি হওয়া। বিশেষ করে ড্রোন ক্ষয়ক্ষতি যুক্তরাষ্ট্রের রিয়েল-টাইম তথ্য সংগ্রহে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে যুদ্ধবিমান হারানো আকাশে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সক্ষমতাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করছে।
সামগ্রিকভাবে এই সংঘাত একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে আনছে—প্রযুক্তিগতভাবে অগ্রসর হওয়া সত্ত্বেও প্রতিপক্ষের সুসংগঠিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মুখে আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণ করা আগের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন হয়ে উঠেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে এখন তাদের কৌশল ও অপারেশনাল পদ্ধতিতে নতুন করে পরিবর্তন আনতে হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
