বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) কি সত্যিই স্বাধীন, নাকি এটি ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে? এই বিতর্কিত প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এনেছেন পাকিস্তানের সাবেক তারকা অফ-স্পিনার সাঈদ আজমল। করাচিতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি দাবি করেন, আইসিসি যদি বিসিসিআই-এর প্রভাবমুক্ত হয়ে নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত নিতে না পারে, তবে এমন একটি ঠুটো জগন্নাথ সংস্থার টিকে থাকার কোনো যৌক্তিকতা নেই। ২০০৯ সালে পাকিস্তানের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম এই নায়ক মনে করেন, বর্তমানে আইসিসি কেবল নামেই বৈশ্বিক সংস্থা, বাস্তবে এটি একটি নির্দিষ্ট দেশের স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
বিসিসিআই-এর একচ্ছত্র আধিপত্য ও আইসিসির ভূমিকা
সাঈদ আজমলের মতে, টেস্ট খেলুড়ে অধিকাংশ দেশের প্রতিনিধিরাই মনে মনে আইসিসির ওপর ভারতের প্রভাব নিয়ে বিরক্ত, কিন্তু অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণে তারা মুখ খোলার সাহস পান না। ভারতের সংবাদ সংস্থা পিটিআই-এর বরাতে আজমল জানান, আইসিসি যদি ভারতের ওপর নিজেদের নিয়ম বা সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে ব্যর্থ হয়, তবে তাদের অস্তিত্বের কোনো প্রয়োজন নেই। তিনি উদাহরণ হিসেবে চ্যাম্পিয়নস ট্রফি এবং ভারত-পাকিস্তান সিরিজ নিয়ে আইসিসির ‘অসহায়’ অবস্থানের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, ভারত পাকিস্তানে খেলতে না যাওয়ার পেছনে কোনো অকাট্য ক্রিকেটীয় কারণ নেই, অথচ আইসিসি বরাবরই ভারতের এই অনড় অবস্থানকে প্রশ্রয় দিয়ে আসছে।
ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেটীয় সম্পর্কের টানাপোড়েন ও বর্তমান প্রেক্ষাপট নিচের সারণিতে তুলে ধরা হলো:
ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেটীয় দ্বৈরথ ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
| বিষয়ের ক্ষেত্র | গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও সময়রেখা |
| সর্বশেষ দ্বিপক্ষীয় সিরিজ | ২০১২-১৩ মৌসুমে (ভারত সফরে গিয়েছিল পাকিস্তান)। |
| ভারতের পাকিস্তান সফর | সর্বশেষ ২০০৮ সালে (এশিয়া কাপের জন্য)। |
| আইসিসি নেতৃত্ব | জয় শাহ (বিসিসিআই-এর সাবেক সচিব ও বর্তমান আইসিসি চেয়ারম্যান)। |
| চ্যাম্পিয়নস ট্রফি ২০২৫ | ভারতের আপত্তিতে তাদের সব ম্যাচ পাকিস্তান থেকে দুবাইয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়। |
| টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৬ | যৌথ আয়োজক ভারত ও শ্রীলঙ্কা; পাকিস্তান কেবল শ্রীলঙ্কায় খেলবে। |
| সাঈদ আজমলের পরিসংখ্যান | ২১২ আন্তর্জাতিক ম্যাচে ৪৫১টি উইকেট শিকার করেছেন। |
জয় শাহর নেতৃত্ব ও আইসিসির নতুন সমীকরণ
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আইসিসি চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন জয় শাহ। এর আগে তিনি বিসিসিআই-এর সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আজমলের মতে, জয় শাহর হাতে আইসিসির ব্যাটন যাওয়ায় সংস্থাটির ওপর ভারতের নিয়ন্ত্রণ আরও পাকাপোক্ত হয়েছে। বিশেষ করে গত বছর পাকিস্তানে আয়োজিত চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে ভারতের আপত্তির মুখে টুর্নামেন্টের কাঠামো বদলে ‘হাইব্রিড মডেল’ অনুসরণ করা হয়। এর ফলে অন্য দলগুলোকে ভারতের বিপক্ষে খেলতে পাকিস্তান থেকে দুবাইয়ে উড়ে যেতে হয়েছে, যা টুর্নামেন্টের নিরপেক্ষতাকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
পাল্টা অবস্থানে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি)
দীর্ঘদিন ধরে ভারত পাকিস্তানে খেলতে না গেলেও পাকিস্তান দল ২০১৬ এবং ২০২৩ সালে ভারতে গিয়ে বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছিল। তবে বর্তমানে পিসিবিও কঠোর অবস্থানে ফিরেছে। আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হতে যাওয়া টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আয়োজক ভারত ও শ্রীলঙ্কা হলেও পাকিস্তান সরকার ও বোর্ড সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা ভারতের মাটিতে কোনো ম্যাচ খেলবে না। এর পরিবর্তে পাকিস্তানের সকল ম্যাচ শ্রীলঙ্কায় আয়োজনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সাঈদ আজমল মনে করেন, ক্রিকেটের মতো একটি জনপ্রিয় খেলার মর্যাদা রক্ষা করতে হলে আইসিসিকে অবশ্যই বিসিসিআই-এর কক্ষপথ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। অন্যথায়, ক্রিকেট বিশ্বের ভারসাম্য নষ্ট হবে এবং বৈশ্বিক আসরগুলো কেবল একটি দেশের খেয়ালখুশির ওপর নির্ভর করবে। ২০১৭ সালে ক্রিকেটকে বিদায় জানানো এই স্পিনার মনে করেন, ক্রিকেটকে বাঁচাতে হলে আইসিসিকে এখনই নিরপেক্ষতার প্রমাণ দিতে হবে।
