বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)-এর চেয়ারম্যান পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকায় দেশের বিমা খাতে গভীর স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। গত ২ মার্চ সংস্থাটির চেয়ারম্যান এম আসলাম আলম পদত্যাগ করার পর টানা ২৬ দিন অতিবাহিত হলেও এখনো নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি কার্যত নেতৃত্বহীন অবস্থায় রয়েছে, যা বিমা খাতের সামগ্রিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
আইডিআরএ দেশের বিমা খাতের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিমা কোম্পানির লাইসেন্স প্রদান, নীতিমালা প্রণয়ন, দাবি নিষ্পত্তি তদারকি এবং বাজার শৃঙ্খলা বজায় রাখার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু বর্তমানে চেয়ারম্যান বা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান না থাকায় এসব কার্যক্রমের বড় অংশ কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে নতুন নীতিমালা অনুমোদন, অনিয়ম সংক্রান্ত তদন্ত এবং খাত সংস্কারের বিভিন্ন উদ্যোগ থমকে আছে।
সংস্থার অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, বর্তমানে শুধুমাত্র সীমিত পরিসরে কিছু প্রশাসনিক ও নিয়োগসংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। অথচ অতীতে চেয়ারম্যান পদ শূন্য হলে দ্রুততার সঙ্গে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হতো অথবা নতুন চেয়ারম্যান নিযুক্ত করা হতো। এবার সেই প্রচলিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
উল্লেখ্য, এম আসলাম আলম ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিন বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে তিনি দীর্ঘ সময় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং সরকারি প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর আগে সাবেক সচিব মোহাম্মদ জয়নুল বারী ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই পদে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমান শূন্যতা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ বলে সংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করেছেন।
আইডিআরএর মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি জানিয়েছেন, চেয়ারম্যান পদ খালি থাকায় সংস্থার কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, “নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না।”
এদিকে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এই দীর্ঘ নেতৃত্ব সংকট বিমা খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মাইন উদ্দিন বলেন, একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা নেতৃত্বহীন থাকলে খাতের শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি দ্রুত নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একইভাবে জেনিথ ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম নুরুজ্জামান জানান, চেয়ারম্যান না থাকায় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় দুর্বলতা তৈরি হচ্ছে, যা খাতের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো বিমা দাবির নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন বিমা কোম্পানির কাছে গ্রাহকদের প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার দাবি বকেয়া রয়েছে। নেতৃত্ব সংকটের কারণে এসব দাবি নিষ্পত্তির গতি আরও মন্থর হয়ে পড়েছে, ফলে গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে এবং বিমা খাতের প্রতি আস্থা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নিচে বর্তমান পরিস্থিতির সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হলো:
| বিষয় | বর্তমান অবস্থা |
|---|---|
| চেয়ারম্যান পদ | ২৬ দিন ধরে শূন্য |
| সর্বশেষ চেয়ারম্যান | এম আসলাম আলম (পদত্যাগ: ২ মার্চ) |
| ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান | নিয়োগ দেওয়া হয়নি |
| কার্যক্রমের অবস্থা | আংশিক স্থবির |
| বকেয়া বিমা দাবি | প্রায় ৮,০০০ কোটি টাকা |
| নীতিনির্ধারণ কার্যক্রম | স্থগিত বা বিলম্বিত |
বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট সাঈদ আহমেদ বলেছেন, চেয়ারম্যান নিয়োগে বিলম্বের কারণে খাতের ওপর নজরদারি দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং বিনিয়োগকারী ও গ্রাহকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। তিনি দ্রুত এই পদে নিয়োগ দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
অন্যদিকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক জানিয়েছেন, এখনো চূড়ান্ত কোনো নাম নির্ধারণ করা হয়নি। তবে শিগগিরই নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হবে বলে আশা করা হচ্ছে। জানা গেছে, সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট বিভাগে প্রশাসনিক পরিবর্তন হওয়ায় নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। নতুন সচিব দায়িত্ব গ্রহণের পর বিষয়টি পুনর্মূল্যায়ন করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, আইডিআরএর এই নেতৃত্ব সংকট শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক সমস্যা নয়; বরং এটি দেশের বিমা খাতের স্থিতিশীলতা, গ্রাহক আস্থা এবং আর্থিক নিরাপত্তার ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে। তাই দ্রুত নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের মাধ্যমে এই স্থবিরতা কাটিয়ে ওঠা এখন অত্যন্ত জরুরি।
