আইএসের উৎপত্তি ও উত্থান, কি কিভাবে হলো

আধুনিক যুগের সন্ত্রাসবাদ নিয়ে যেকোনো আলোচনায় যে নামটি সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়, সেটি হলো আইএস—Islamic State। আল-কায়েদার পর বিশ্বে সবচেয়ে সহিংস ও সংগঠিত জঙ্গি গোষ্ঠী হিসেবে আইএস একসময় গড়ে তুলেছিল একটি বিপজ্জনক ‘ছায়া-রাষ্ট্র’। আজ আমরা আলোচনা করব—এই সংগঠনের সৃষ্টি কীভাবে, কোন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এর জন্ম, কারা নেতৃত্ব দিয়েছে, এবং কীভাবে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা পুঁজি করে আইএস সামরিক ও আর্থিক শক্তি অর্জন করেছিল।

 

আইএসের উৎপত্তি ও উত্থান, কি কিভাবে হলো

 

আইএসের জন্ম: মার্কিন আগ্রাসন–পরবর্তী ইরাক থেকেই সূচনা

আইএসের জন্ম হয় না একদিনে, বরং দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামরিক ব্যর্থতার ধারাবাহিকতার মধ্য থেকেই। ২০০৩ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনী সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করলে ইরাকের রাজনৈতিক ক্ষমতার কাঠামো ভেঙে পড়ে। বিশেষ করে সুন্নি জনগোষ্ঠী—যারা আগে সাদ্দামের আমলে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর কেন্দ্রীয় অবস্থানে ছিল—তারা দ্রুত বঞ্চিত হতে শুরু করে।

এই বঞ্চনা থেকেই জন্ম নেয় অসন্তোষ, আর সেই অসন্তোষকেই কাজে লাগায় আল-কায়েদার ইরাক শাখা (AQI)—যার নেতৃত্বে ছিলেন আবু মুসাব আল-জারকাউই। পরে জারকাউই নিহত হলে সংগঠনটির নেতৃত্ব আসে আবু বকর আল-বাগদাদির হাতে।

 

google news
গুগোল নিউজে আমাদের ফলো করুন

 

 

আল-কায়েদা থেকে আইএস: বিভক্তির ইতিহাস

বাগদাদি নেতৃত্ব গ্রহণ করার পর AQI ধীরে ধীরে একটি আলাদা পরিচয় নিতে শুরু করে। ২০১৩ সালে তারা নিজেদের নাম দেয়:

Islamic State in Iraq and the Levant (ISIL)

অথবা

Islamic State in Iraq and Syria (ISIS)

পরবর্তীতে ২০১৪ সালে মসুল দখলের পর বাগদাদি ঘোষণা দেয়—একটি নতুন “খিলাফত” প্রতিষ্ঠার। তখন থেকেই সংগঠনটির নাম হয়—Islamic State (IS)

আইএস বনাম আল-কায়েদা: লক্ষ্য ও পদ্ধতিতে মৌলিক পার্থক্য

যদিও উভয়ের আদর্শগত ভিত্তি উগ্র ইসলামবাদ, তবে তাদের কৌশল ভিন্ন:

আল-কায়েদা

  • মূল লক্ষ্য: যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বে আক্রমণ
  • কৌশল: আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে হামলা পরিচালনা
  • নেতৃত্ব: আয়মান আল-জাওয়াহিরি

আইএস

  • মূল লক্ষ্য: ভূখণ্ড দখল করে ‘রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠা
  • কৌশল: নিষ্ঠুর আতঙ্ক সৃষ্টির মাধ্যমে দ্রুত দখল বিস্তার
  • লক্ষ্যবস্তু: শুধু পশ্চিমা বিশ্ব নয়—শিয়া মুসলিম, খ্রিষ্টান, এবং ভিন্নমতাবলম্বী সুন্নি জনগোষ্ঠীও

এই কারণে আইএসকে অনেক গবেষক “আধুনিক যুগের সবচেয়ে উগ্র ও নির্মম উগ্রবাদী সংগঠন” হিসেবে বর্ণনা করেন।

বাগদাদি: রহস্যময় নেতা, নিষ্ঠুর রণকৌশল

আইএসের নেতা আবু বকর আল-বাগদাদি ছিলেন আত্মগোপনে থাকা এক শক্তিশালী রণকৌশলী।

  • জন্ম: ১৯৭১, সামারা, ইরাক
  • মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু: ২০০৩
  • আল-কায়েদার ইরাক শাখার নেতা: ২০১০
  • আইএস প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব: ২০১৩–১৪

বাগদাদির নেতৃত্বে আইএস হয়ে ওঠে সংগঠিত, প্রযুক্তি-সক্ষম, এবং বহুমুখী আর্থিক উৎসসমৃদ্ধ একটি ‘সন্ত্রাসী রাষ্ট্র’।

সিরিয়া ও ইরাকে সুন্নিদের বঞ্চনা: আইএস বিস্তারের মূল জ্বালানী

২০১১ সালে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হলে সুন্নি বিদ্রোহীদের অসন্তোষকে কাজে লাগায় আইএস।
একই সময়ে ইরাকে মালিকি সরকারের শিয়া-কেন্দ্রিক নীতির কারণে সুন্নিরা ক্রমশ ক্ষমতাহীন হয়ে পড়েন।

এই দুই দেশের:

  • রাজনৈতিক সংকট
  • সাম্প্রদায়িক বঞ্চনা
  • প্রশাসনিক ব্যর্থতা
  • দখলদারিত্ব–উত্তর বিশৃঙ্খলা

এই সবকিছুই আইএসকে দিয়েছে বিস্তারের উর্বর ক্ষেত্র।

আইএসের আঞ্চলিক প্রভাব: লিবিয়া থেকে ফিলিপাইন পর্যন্ত

বিশ্লেষকেরা বলেন, ইরাক-সিরিয়ার বাইরেও অনেক অঞ্চলে আইএসের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে, যেমন:

  • লিবিয়া
  • মিসর (সিনাই)
  • নাইজেরিয়া (বোকো হারামের মাধ্যমে)
  • পাকিস্তান
  • ইন্দোনেশিয়া
  • ফিলিপাইন

এই অঞ্চলগুলোতে আইএস স্থানীয় জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে মতাদর্শগত ও কার্যত সহযোগিতা গড়ে তোলে।

আইএসের সামরিক বিজয়: দ্রুত বিস্তার, দ্রুত পতন

মূল সামরিক সাফল্যগুলো

  • রাকা (সিরিয়া) দখল: ২০১৩ – আইএসের মূল ঘাঁটি
  • ফালুজা (ইরাক) দখল: জানুয়ারি ২০১৪
  • মসুল দখল: জুন ২০১৪ – আইএসের সবচেয়ে বড় সাফল্য

আইএস দখলকৃত অঞ্চলগুলোতে কঠোর শরিয়াহ আইন, লাশ ঝুলিয়ে রাখা, প্রকাশ্যে শিরশ্ছেদ, নারীদের দাসত্ব, সংখ্যালঘুদের নির্বাসন—এমন ভয়াবহ নিষ্ঠুরতা চালায়।

আইএসের অর্থনীতি: বিশ্বের সবচেয়ে ধনী জঙ্গি সংগঠন

আইএসের আয় ছিল বহুমুখী:

  • তেলক্ষেত্র দখল: উত্তর ইরাকের তেল বিক্রি করে কোটি কোটি ডলার
  • মসুল ব্যাংক লুট
  • ধর্মীয় কর (জিজিয়া)—খ্রিষ্টানসহ সংখ্যালঘুদের ওপর
  • মানবপাচার ও দাসব্যবসা
  • দেশি-বিদেশি জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় – শুধু ২০১৪ সালেই প্রায় ২০ মিলিয়ন ডলার

২০১৪ সালের মধ্যে আইএসের সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার—যা ইতিহাসের যেকোনো সন্ত্রাসী সংগঠনের মধ্যে সর্বোচ্চ।

আইএসের পতন: সামরিক চাপ ও জনসমর্থন হারানো

২০১৬–১৭ সালের দিকে যুক্তরাষ্ট্রনেতৃত্বাধীন জোট, ইরাকি বাহিনী, সিরিয়ার কুর্দি মিলিশিয়া এবং রাশিয়ার আক্রমণে আইএস দ্রুত ভূখণ্ড হারাতে শুরু করে।

২০১৭ সালে:

  • রাকা পতন
  • মসুল পতন

এরপর আইএস রাষ্ট্রীয় কাঠামো হারিয়ে আবার ছায়া-অপারেশনে ফিরে যায়।

আইএসের উত্থান কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—বরং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সংকট, সাম্প্রদায়িক বিভাজন, আন্তর্জাতিক যুদ্ধনীতি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বঞ্চনার একটি জটিল ফলাফল। সুন্নিদের বঞ্চনা, প্রশাসনিক ব্যর্থতা, মার্কিন আগ্রাসন, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ এবং আল-কায়েদার নেতৃত্ব সংকট মিলিয়েই সৃষ্টি করেছিল আইএস।

তাদের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—
যখন রাষ্ট্র দুর্বল হয়, দুর্ভাগ্যক্রমে সেই শূন্যস্থান দখল করে সন্ত্রাস।

Leave a Comment