অমর্ত্য সেনকে ভোটার তালিকায় তলব: আইনি লড়াইয়ে তৃণমূল

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সংঘাত এক নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষের নাম বাদ দেওয়া এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের তলবের ঘটনায় সরাসরি নির্বাচন কমিশন ও বিজেপির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলেছে রাজ্যের ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেস। এই সংকটের সুরাহা করতে ইতিমধ্যে তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে।

অমর্ত্য সেনসহ বিশিষ্টজনদের নোটিশ ও কমিশনের ব্যাখ্যা

রাজ্যজুড়ে ভোটার তালিকা সংশোধনের শুনানি চলাকালীন বীরভূমের এক জনসভায় তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জি একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস করেন। তিনি জানান, নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনকেও সাধারণ ভোটারের মতো শুনানির জন্য সরকারি দপ্তরে তলব করা হয়েছে। শুধু অমর্ত্য সেনই নন, ভারতীয় তারকা ক্রিকেটার মোহাম্মদ শামি এবং তৃণমূলের অভিনেতা সাংসদ দেবকেও একইভাবে নোটিশ পাঠানো হয়েছে।

এই খবর জানাজানি হওয়ার পর বুদ্ধিজীবী মহল ও রাজনৈতিক মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে নির্বাচন কমিশন দ্রুত এক বিবৃতিতে জানায় যে, অমর্ত্য সেনের ভোটার কার্ডের তথ্য সংশোধনে কিছু ত্রুটি ছিল এবং কমিশনের সফটওয়্যারের মাধ্যমে এই নোটিশটি ‘স্বয়ংক্রিয়ভাবে’ তৈরি হয়ে গিয়েছিল। কমিশন আরও স্পষ্ট করে যে, তাঁকে সশরীরে আসতে হবে না; বরং নির্বাচন দপ্তরের কর্মকর্তারা তাঁর বাড়িতে গিয়ে ত্রুটি সংশোধন করে আনবেন।

ভোটার তালিকা সংক্রান্ত বিরোধের মূল বিষয়গুলো নিচে সারণি আকারে তুলে ধরা হলো:

পশ্চিমবঙ্গ ভোটার তালিকা সংশোধন ও বিতর্কের সারসংক্ষেপ

বিষয়ের ক্ষেত্রবিস্তারিত তথ্য
বিতর্কের সূত্রপাতভোটার তালিকা থেকে গণহারে নাম বাদ দেওয়া ও হয়রানি।
নোটিশপ্রাপ্ত বিশিষ্টজনঅমর্ত্য সেন, মোহাম্মদ শামি ও অভিনেতা দেব।
কমিশনের সাফাইসফটওয়্যারের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ‘স্বয়ংক্রিয়’ নোটিশ।
তৃণমূলের আইনি পদক্ষেপসুপ্রিম কোর্টে মামলা (আবেদনকারী ডেরেক ও’ব্রায়েন)।
আদালতে তৃণমূলের আরজি১৫ জানুয়ারির সময়সীমা বাড়ানো ও চূড়ান্ত তালিকা স্থগিত রাখা।
বিজেপির পাল্টা অভিযোগভুয়া ভোটারদের নাম তালিকাভুক্ত করার চেষ্টা চলছে।
চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের তারিখ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬।

সুপ্রিম কোর্টে তৃণমূলের লড়াই ও অভিযোগ

তৃণমূলের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন বর্তমানে বিজেপির আইটি সেলের সরবরাহ করা প্রযুক্তি ও অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার করে ভোটার তালিকা সংশোধন করছে। তৃণমূল সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েনের মাধ্যমে করা আবেদনে বলা হয়েছে, প্রবীণ ও শারীরিক সক্ষমতা হারানো ভোটারদেরও মাইলের পর মাইল দূরে সরকারি দপ্তরে শুনানির জন্য ডেকে হয়রানি করা হচ্ছে। তৃণমূলের দাবি, হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে কোনো নির্দেশিকা জারি করা যাবে না এবং স্থায়ী আবাসন বা পঞ্চায়েত ঠিকানায় বসবাসকেও বৈধতা দিতে হবে।

রাজনৈতিক চাপানউতোর

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই গোটা প্রক্রিয়াকে ‘বিজেপির চক্রান্ত’ বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে, রাজ্য বিজেপির বিধায়ক ও প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অশোক লাহিড়ী আইনের সমানাধিকারের কথা বললেও ভুল নোটিশের বিহিত চেয়েছেন। তবে বিরোধী দলীয় নেতা শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, ক্ষমতাসীন দল চাইছে নতুন তালিকায় নিজেদের ‘ক্যাডার’ ও ‘ভুয়া ভোটার’দের নাম ঢুকিয়ে দিতে।

সব মিলিয়ে, অমর্ত্য সেনের মতো ব্যক্তিত্বকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই বিতর্ক পশ্চিমবঙ্গ রাজনীতির উত্তাপ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, সুপ্রিম কোর্ট ভোটার তালিকা সংশোধনের সময়সীমা বৃদ্ধি বা প্রক্রিয়াটি স্থগিত করার বিষয়ে কী রায় দেয়।