১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর ঢাকার জনসংখ্যা ও নগরায়ণ দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে। এই ক্রমবর্ধমান চাপ সামাল দিতে ১৯৬০-এর দশ কে তৎকালীন (Dhaka Improvement Trust) (ডিআইটি) পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করে। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই বর্তমান গুলশান এলাকাকে একটি আধুনিক “মডেল টাউন” হিসেবে নির্বাচন করা হয়।
১৯৬১ সালের দিকে সরকারি উদ্যোগে এ অঞ্চলের বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চল অধিগ্রহণ করা হয় এবং ধাপে ধাপে অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ শুরু হয়। একজন প্রভাবশালী প্রশাসনিক কর্মকর্তার উদ্যোগে এলাকাটির নামকরণ করা হয় “গুলশান”—যার অর্থ “ফুলের বাগান”। নামটি অনুপ্রাণিত হয়েছিল Karachi শহরের একটি অভিজাত এলাকার নাম থেকে।
অবকাঠামো ও নগরায়ণের সূচনার কথা-
প্রথমদিকে গুলশান ছিল প্রায় অবকাঠামোহীন একটি এলাকা। রাস্তা, সেতু, বাজার, থানা কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান—কিছুই তেমন ছিল না। মহাখালী থেকে হেঁটে এই এলাকায় আসাই ছিল তখনকার বাস্তবতা।
তবে পরিকল্পিত উন্নয়নের ফলে ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে চিত্রটি।
লেক খনন করে জমি ভরাট ও সড়ক নির্মাণ
সেতু ও সংযোগ পথ তৈরি
বাজার ও মৌলিক নাগরিক সুবিধা স্থাপন
সড়কবাতি ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন
শুরুর দিকে কয়েকটি শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ছাড়া বড় কোনো স্থাপনা ছিল না। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উচ্চবিত্ত ও অভিজাত শ্রেণির মানুষ ডিআইটি থেকে প্লট বরাদ্দ নিয়ে বসতি গড়ে তুলতে শুরু করেন।
তখন একটি ২০ কাঠার প্লটের মূল্য ছিল মাত্র ২০–২৫ হাজার টাকা। প্রথম দিকের বাসিন্দারা ছোট কিন্তু নান্দনিক বাড়ি, ফুলের বাগান ও সামাজিক পরিবেশ তৈরি করে এলাকাটিকে ধীরে ধীরে একটি অভিজাত আবাসিক অঞ্চলে পরিণত করেন।
প্রশাসনিক উন্নয়ন ও আধুনিক গুলশান-
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর গুলশান এলাকার প্রশাসনিক কাঠামো আরও সুসংগঠিত হয়। ১৯৭১ সালের পর এখানে থানার কার্যক্রম চালু হয় এবং ১৯৮০-এর দশকে এটি ঢাকা পৌরসভার অন্তর্ভুক্ত হয়। পরবর্তীতে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)-এর আওতায় নগর পরিকল্পনা ও উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়।
ক্রমেই গুলশান বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হয়। বর্তমানে এখানে রয়েছে—
বিভিন্ন দেশের দূতাবাস
আন্তর্জাতিক সংস্থা
বহুজাতিক কোম্পানি
শীর্ষস্থানীয় ব্যাংক ও কর্পোরেট অফিস
বিলাসবহুল হোটেল ও রেস্তোরাঁ
ভূমি ব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও চ্যালেঞ্জ
গুলশানের জমির মূল্য বর্তমানে আকাশছোঁয়া—একটি ২০ কাঠার প্লটের দাম এখন ৬০ থেকে ১০০ কোটিরও বেশি। এই বিপুল অর্থমূল্যকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময়ে জমি নিয়ে অনিয়ম, জালিয়াতি ও দুর্নীতির অভিযোগও উঠে এসেছে।
ঐতিহাসিকভাবে জানা যায়, ডিআইটি ১৯৫৭ সালে জমি অধিগ্রহণের পর প্রকৃত মালিকদের ক্ষতিপূরণ প্রদান করে এবং মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন করে। পরবর্তী সময়ে এলএ (Land Acquisition) কেস অনুযায়ী অধিকাংশ মালিকই তাদের প্রাপ্য অর্থ গ্রহণ করেন।
তবে অভিযোগ রয়েছে যে—
কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী গোষ্ঠী জাল দলিল ও ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে জমির মালিকানা দাবি করেছে।
মূল নথি গায়েব বা বিকৃত করার ঘটনাও ঘটেছে।
অনুমোদনহীন বহুতল ভবন নির্মাণ ও বিক্রির মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
অনেক ক্ষেত্রে ফ্ল্যাট ক্রেতারা বৈধ রেজিস্ট্রেশন না পেয়ে আইনি জটিলতায় পড়েছেন এবং আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন।
এমন পরিস্থিতিতে সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। শক্তিশালী তদন্ত, সঠিক নথি যাচাই এবং পরিকল্পিত ভূমি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই গুরুত্বপূর্ণ এলাকাটিকে সুরক্ষিত রাখা প্রয়োজন। এটির মাধ্যেমে যেমন এলাকাটির সামজিক সুরক্ষা নিশ্চিত হবে, পাশাপাশি সরকার হাজার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় করতে পারবে।
কারন আজকের গুলশান শুধুমাত্র একটি আবাসিক এলাকা নয়; এটি বাংলাদেশের কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আধুনিক নগর জীবনের প্রতীক। পরিকল্পিত নগরায়ণের একটি সফল উদাহরণ হিসেবে এর গুরুত্ব অপরিসীম।
তবে এই অর্জনকে টেকসই রাখতে হলে সুশাসন, আইনের প্রয়োগ এবং স্বচ্ছ ভূমি ব্যবস্থাপনার কোনো বিকল্প নেই।
চলবে……..
লেখকঃ এ বি এম জাকিরুল হক টিটন
সম্পাদক ও প্রকাশক, জি লাইভ ২৪
