অবৈধ অস্ত্রের দাপটে একের পর এক হত্যাকাণ্ড

রাজধানীসহ সারা দেশে সম্প্রতি আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের উদ্বেগ তীব্রতর হয়েছে। পল্লবীর যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়াকে প্রকাশ্যে মিনিটের ভগ্নাংশ সময়ে যেভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে—ঘটনা শুধু একটি খুন নয়; এটি আরও বড় সংকটের প্রতীক।

সোমবার সন্ধ্যায় পল্লবীর সি ব্লকের ৫ নম্বর রোডে হেলমেট-পরিহিত তিন সন্ত্রাসী মোটরসাইকেলে এসে দোকানে ঢুকে মাত্র ১০ সেকেন্ডে সাত রাউন্ড গুলি করে কিবরিয়াকে হত্যা করে। এমন নির্লজ্জ বেপরোয়া সহিংসতা দেখাচ্ছে—অপরাধীরা নিশ্চিত যে তাদের হাতে এমন শক্তিশালী অস্ত্র আছে যা চাইলে মুহূর্তে খুন করতে পারে এবং পালিয়ে যেতে পারে। রিকশাচালককে গুলি করা এ নির্মমতারই প্রমাণ।

সাম্প্রতিক সময়ে গুলি করে হত্যার ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। আদালতপাড়ায় সন্ত্রাসী মামুনকে প্রকাশ্যে হত্যা, লক্ষ্মীপুরে বিএনপি নেতা আবুল কালামকে গুলি করা, চট্টগ্রামে প্রাইভেট কার থামিয়ে ব্যবসায়ী হত্যা—এ সবই ইঙ্গিত দেয় অপরাধীরা আগের তুলনায় আরও সংগঠিত ও সশস্ত্র।

এই পরিস্থিতির অন্যতম বড় কারণ—গণ-অভ্যুত্থানের সময় লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ সরকারি অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া। পুলিশ সূত্র জানায়, ৫,৭৫০টি অস্ত্রের ১,৩৪২টি এখনও নিখোঁজ। এর মধ্যে ভয়ংকর ভারী আগ্নেয়াস্ত্রও রয়েছে। এগুলো এক বছর ধরে বিভিন্ন অপরাধে ব্যবহার হচ্ছে।

তার ওপর দেশের অন্তত ৩০টি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে নিয়মিত অস্ত্র পাচার হচ্ছে। মিয়ানমার সীমান্তের সাতটি পয়েন্ট—বাইশফাঁড়ি, বালুখালী, নলবুনিয়া, উনচিপ্রাং, লেদা, জাদিমুরা, নয়াপড়া—সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। পাহাড়ি সন্ত্রাসী দল, রোহিঙ্গা গ্যাং, চরমপন্থী গোষ্ঠী এবং আন্তর্জাতিক অস্ত্রকারবারিরা এসব রুট নিয়ন্ত্রণ করে। সিলেট সীমান্তও এখন বড় চোরাচালান রুটে পরিণত হয়েছে, যেখানে আসাম, মেঘালয় ও ত্রিপুরা থেকে অস্ত্র প্রবেশ করছে।

গোয়েন্দারা বলছেন—জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে অস্ত্রের প্রবাহ আরও বেড়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক গ্রুপ আধিপত্য বিস্তারে অবৈধ অস্ত্র সংগ্রহ করছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি খুনে রাজনৈতিক কোন্দলের ইঙ্গিত মিলেছে।

স্পষ্টতই দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মাত্রাতিরিক্ত চাপের মুখে। পুলিশ দাবি করছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, কিন্তু মাঠের বাস্তবতা বলছে—অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত সহিংসতা কমার সম্ভাবনা খুবই কম। মানুষের জীবনে নিরাপত্তাহীনতার যে ছায়া নেমে এসেছে, তা কাটাতে এখনই কঠোর অভিযান, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করা প্রয়োজন।