অবহেলা ও সংকটে বীরশ্রেষ্ঠদের স্মৃতি জাদুঘর ও গ্রন্থাগার

মুক্তিযুদ্ধে সর্বোচ্চ বীরত্বের স্বীকৃতি পাওয়া বীরশ্রেষ্ঠদের স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে তোলা হয়েছে গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর। এগুলোর উদ্দেশ্য ছিল নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরা এবং বীরশ্রেষ্ঠদের আত্মত্যাগের গল্প পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই চলছে অবহেলা, জনবল সংকট ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে।

নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীর বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর এ অবহেলার উদাহরণ। এখানে দর্শনার্থী আকৃষ্ট করার কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই। একমাত্র কেয়ারটেকার প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করেন। দেয়ালের রং বিবর্ণ, ৯টি বৈদ্যুতিক ফ্যানের মধ্যে ৫টি অচল, জানালার কাচ ভাঙা, দরজা ও চেয়ার নষ্ট। লাইব্রেরিয়ানের অভাবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বইগুলো পড়ে আছে অযত্ন-অবহেলায়।

ফরিদপুরের বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফ গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘরেও অবস্থার তেমন ভালো নেই। ৫,১৭৯টি বই থাকলেও, বীরশ্রেষ্ঠের ব্যবহৃত স্মৃতিচিহ্ন মাত্র তিনটি। যোগাযোগব্যবস্থা খারাপ হওয়ায় দর্শনার্থীও আসেন কম। স্থায়ী জনবল না থাকায় প্রতিষ্ঠান পরিচালনা হয় মজুরিভিত্তিক কর্মচারীদের মাধ্যমে।

ভোলার বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহি মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর চরম অবহেলায় রয়েছে। লাইব্রেরিয়ান নেই, কেয়ারটেকার দিনমজুরি ভিত্তিতে কাজ করেন। ১৭টি বুকশেলফের মধ্যে ৯টি ঠিক আছে। বই শেলফে খালি বা ভাঙাচোরা অবস্থায়। নতুন কোনো বই দেওয়া হয়নি।

অপরদিকে, ঝিনাইদহের বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহি হামিদুর রহমান গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর তুলনামূলক ভালো অবস্থায় আছে। এখানে প্রতিদিন ১৫০–১৬০ জন পাঠক আসেন। ৫,০০০টির বেশি বই এবং মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত বই রয়েছে। তবে স্থায়ী জনবল নেই, মাসে চুক্তিভিত্তিক বেতন পেয়ে লাইব্রেরিয়ান ও কেয়ারটেকার দায়িত্ব পালন করছেন।

নিচের টেবিলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থাগার ও জাদুঘরের সংক্ষিপ্ত তথ্য তুলে ধরা হলো:

বীরশ্রেষ্ঠস্থানবই সংখ্যাস্মৃতিচিহ্নজনবলবর্তমান সমস্যা
রুহুল আমিননোয়াখালীকিছু বইসীমিত ছবি ও পদক১ কেয়ারটেকারভবন জীর্ণ, বই অযত্ন, পর্যাপ্ত জনবল নেই
মুন্সী আবদুর রউফফরিদপুর5,179৩টি সামান্য স্মৃতিচিহ্ন১ লাইব্রেরিয়ান + ১ কেয়ারটেকারদর্শক কম, স্থায়ী কর্মচারী নেই
মোস্তফা কামালভোলাপ্রাথমিক শিশু ও বিজ্ঞান বইনেই১ কেয়ারটেকারলাইব্রেরিয়ান নেই, বই ও শেলফ ভাঙাচোরা
নূর মোহাম্মদ শেখনড়াইল6,000কিছু ব্যবহৃত জিনিসপত্র১ কেয়ারটেকারমাঝে মাঝে বন্ধ, জনবলসংকট
হামিদুর রহমানঝিনাইদহ5,000+ছবি ও ম্যুরাল১ লাইব্রেরিয়ান + ১ কেয়ারটেকারস্থায়ী কর্মচারী নেই, সপ্তাহে দুই দিন বন্ধ

দেশের বীরশ্রেষ্ঠদের স্মৃতিসৌধকে কার্যকর ও জনপ্রিয় করতে প্রয়োজন যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ, পর্যাপ্ত জনবল, নিয়মিত প্রকাশনা ও দর্শনার্থী আকর্ষণের উদ্যোগ। না হলে, এই স্বকীয় স্মৃতিসংগ্রহ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছানো কঠিন হয়ে যাবে।