অপরিবর্তিত জ্বালানি দামে সরকারি স্থিতি

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলমান সংঘাতের প্রভাব বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে কোথাও কোথাও দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতেও দেশে ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। টানা দ্বিতীয় মাসের মতো এপ্রিল মাসেও ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম বাড়ানো হচ্ছে না।

মঙ্গলবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, এপ্রিল মাসে ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১০০ টাকা, কেরোসিন ১১২ টাকা, পেট্রল ১১৬ টাকা এবং অকটেন ১২০ টাকায় অপরিবর্তিত থাকবে। ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসেও একই দামে এসব জ্বালানি বিক্রি হয়েছে।

সরকারের এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে নেওয়া হয়েছে, যখন আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত জানুয়ারিতে প্রতি লিটার জ্বালানির দাম ২ টাকা এবং ফেব্রুয়ারিতে আরও ২ টাকা কমানো হয়েছিল। এরপর মার্চ ও এপ্রিল মাসে সেই কমানো দামই বহাল রাখা হয়েছে।

২০২৪ সালের মার্চ মাস থেকে সরকার বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি চালু করে। এ ব্যবস্থার আওতায় প্রতি মাসে আগের মাসের আমদানি ব্যয়, আন্তর্জাতিক বাজারের দাম এবং ডলারের বিনিময় হার বিবেচনায় এনে নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়। ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত নির্দেশিকায় বলা হয়, পেট্রল ও অকটেন মূলত ব্যক্তিগত যানবাহনে ব্যবহৃত হওয়ায় এগুলোকে তুলনামূলকভাবে ‘বিলাসদ্রব্য’ হিসেবে বিবেচনা করে ডিজেলের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করা হয়।

জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণে দুটি পৃথক কর্তৃপক্ষ কাজ করে। উড়োজাহাজে ব্যবহৃত জেট ফুয়েল ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত ফার্নেস অয়েলের দাম নির্ধারণ করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। অন্যদিকে, ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে নির্ধারণ করে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের সঙ্গে সমন্বয় করলে দেশে ডিজেলের প্রকৃত বিক্রয়মূল্য প্রায় ২০০ টাকা হওয়া উচিত। কিন্তু ভোক্তাদের ওপর চাপ কমাতে সরকার তা ১০০ টাকায় ধরে রেখেছে। ফলে শুধু এক মাসেই প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি দিতে হচ্ছে সরকারকে।

জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ (টুকু) সংসদে জানিয়েছেন, গত এক মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম প্রায় ৯৮ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেল আমদানিতে সরকারের খরচ পড়ছে প্রায় ১৯৮ টাকা। একইভাবে, অকটেন ১২০ টাকায় বিক্রি হলেও আমদানি ও সরবরাহে সরকারের ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১৫০ টাকা ৭২ পয়সা।

নিচে বর্তমান বিক্রয়মূল্য ও আমদানি ব্যয়ের তুলনামূলক চিত্র দেওয়া হলো—

জ্বালানির ধরনবর্তমান বিক্রয়মূল্য (টাকা/লিটার)আনুমানিক আমদানি খরচ (টাকা/লিটার)
ডিজেল১০০১৯৮
কেরোসিন১১২তথ্য উপলব্ধ নয়
পেট্রল১১৬তথ্য উপলব্ধ নয়
অকটেন১২০১৫০.৭২

বিশ্ববাজারে দামের ঊর্ধ্বগতির পরও দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানি তেলের দাম স্থিতিশীল রাখার এই সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তিদায়ক হলেও সরকারের জন্য বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এই ভর্তুকি টেকসই রাখতে হলে বিকল্প জ্বালানি উৎস, দক্ষ জ্বালানি ব্যবস্থাপনা এবং মূল্য সমন্বয়ের ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ জরুরি হয়ে উঠবে।