পিরোজপুর জেলার নেছারাবাদ উপজেলায় চুরির অভিযোগকে কেন্দ্র করে ইউনিয়ন পরিষদে ডেকে নিয়ে মারধরের পর আব্দুল্লাহ আল মামুন সবুজ (৩৩) নামের এক অটোরিকশাচালকের বিষপানে মৃত্যুর ঘটনায় এলাকাজুড়ে গভীর শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সোমবার (২ মার্চ) রাত প্রায় ৮টার দিকে বরিশালের শেরে-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এ চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। পরিবারের অভিযোগ, প্রকাশ্যে অপমান, শারীরিক নির্যাতন এবং অর্থদণ্ডের চাপে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে আত্মহননের পথ বেছে নেন।
নিহত সবুজ উপজেলার সুটিয়াকাঠী ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বালিয়ারী গ্রামের বাসিন্দা। তিনি হুমায়ুন কবির খানের ছেলে এবং জীবিকার তাগিদে দীর্ঘদিন ধরে অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালাতেন। পরিবারে স্ত্রী ও পাঁচ বছরের একমাত্র ছেলে রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সবুজ শান্ত ও পরিশ্রমী মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং তার বিরুদ্ধে পূর্বে কোনো অপরাধের অভিযোগ শোনা যায়নি।
Table of Contents
অভিযোগ ও সালিশের ঘটনা
পরিবার সূত্রে জানা যায়, ১ মার্চ সকালে গ্রাম চৌকিদার মো. হানিফ এবং স্থানীয় দোকানদার রুবেল ও আব্দুল হাই সবুজকে ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে নিয়ে যান। অভিযোগ তোলা হয়, তিনি দুটি দোকান থেকে সিগারেট ও নগদ অর্থ চুরি করেছেন। বিকেলের দিকে পরিবারের সদস্যদের জানানো হয়, সবুজকে ইউনিয়ন পরিষদে মারধর করা হয়েছে এবং ৩০ হাজার টাকা জরিমানা ধার্য করা হয়েছে।
নিহতের মা শাহিদা বেগম বলেন, “আমার ছেলেকে না শুনেই অপরাধী বানানো হয়েছে। লোকজনের সামনে অপমান ও মারধরের পর সে ভেঙে পড়ে।” পরিবারের দাবি, ঘটনার পর সবুজ বাড়িতে ফিরে চরম লজ্জা, অপমানবোধ ও মানসিক যন্ত্রণায় বিষপান করেন।
স্ত্রী সুমি বেগম অভিযোগ করেন, “জোর করে মারধর করে মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছে। আমাদের ছোট ছেলের সামনেই তাকে অপদস্থ করা হয়েছে। সে অপবাদ সইতে না পেরে নিজের জীবন কেড়ে নিয়েছে।” তিনি দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
প্রশাসনের বক্তব্য ও তদন্ত
ওয়ার্ড চৌকিদার মো. হানিফের দাবি, সবুজ স্বেচ্ছায় চুরির কথা স্বীকার করেছিলেন এবং সামাজিকভাবে বিষয়টির নিষ্পত্তি করা হয়। তবে তিনি স্বীকার করেন, পরে জানতে পারেন সবুজ বাড়িতে গিয়ে বিষপান করেছেন।
সুটিয়াকাঠী ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. শানু বলেন, “চুরির বিষয়টি সে স্বীকার করেছিল। উত্তেজিত জনতা কয়েকটি ঘুষি মেরে থাকতে পারে। এরপর মানসিক চাপে সে আত্মহত্যা করেছে বলে শুনেছি।”
এ বিষয়ে নেছারাবাদ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসান জানান, রোববার ইফতারের সময় সবুজ বিষপান করেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। পরে তাকে দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তিনি বলেন, “ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ঘটনার সারসংক্ষেপ
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| নিহতের নাম | আব্দুল্লাহ আল মামুন সবুজ (৩৩) |
| পেশা | অটোরিকশাচালক |
| ঠিকানা | বালিয়ারী গ্রাম, সুটিয়াকাঠী ইউনিয়ন, নেছারাবাদ |
| অভিযোগ | সিগারেট ও নগদ অর্থ চুরি |
| অভিযোগের পরিণতি | মারধর ও ৩০ হাজার টাকা জরিমানা |
| বিষপানের সময় | ১ মার্চ, ইফতারের সময় |
| মৃত্যু | ২ মার্চ রাত ৮টা, শেরে-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল |
সামাজিক ও মানবিক প্রেক্ষাপট
এ ঘটনায় স্থানীয়ভাবে বিচারপ্রক্রিয়া, সামাজিক সালিশ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। মানবাধিকার সচেতন মহলের মতে, অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে প্রকাশ্যে অপমান বা শাস্তি দেওয়া আইনের শাসনের পরিপন্থী। এমন পরিস্থিতিতে মানসিক আঘাত একজন মানুষকে চরম সিদ্ধান্ত নিতে প্ররোচিত করতে পারে।
সবুজের মৃত্যুতে তার পরিবার এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে স্ত্রী ও ছোট সন্তান অসহায় হয়ে পড়েছেন। এলাকাবাসী নিরপেক্ষ তদন্ত ও দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। তদন্তের অগ্রগতি এবং প্রশাসনের পদক্ষেপের দিকেই এখন সবার দৃষ্টি।
