স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি পূরণে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের ব্যক্তিগত সম্পদের বিবরণী প্রকাশ করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। মঙ্গলবার প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসসহ উপদেষ্টা পরিষদের সকল সদস্যের গত ৩০ জুন ২০২৫ পর্যন্ত অর্জিত স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই উপদেষ্টাদের সম্পদ প্রকাশের দাবি জোরালো হয়ে উঠেছিল, যা এই পদক্ষেপের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হলো।
Table of Contents
প্রধান উপদেষ্টার সম্পদের খতিয়ান
বিবরণী অনুযায়ী, গত এক বছরে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নিট সম্পদ বৃদ্ধি পেয়েছে। ৩০ জুন ২০২৫ পর্যন্ত তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৫ কোটি ৬২ লাখ ৪৪ হাজার ৬৫ টাকা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশই হলো আর্থিক সম্পদ, যার পরিমাণ ১৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। তাঁর স্ত্রী আফরোজী ইউনূসের সম্পদের পরিমাণ বর্তমানে ১ কোটি ২৭ লাখ টাকা, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় প্রায় ৮৪ লাখ টাকা হ্রাস পেয়েছে। ড. ইউনূসের কোনো ব্যক্তিগত দায় না থাকলেও তাঁর স্ত্রীর ১৬ লাখ ৯৬ হাজার টাকার ঋণ রয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টাদের সম্পদের তুলনামূলক চিত্র
প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, বাণিজ্যিক খাতের সাথে যুক্ত থাকা উপদেষ্টাদের সম্পদের পরিমাণ অপেক্ষাকৃত বেশি। বিশেষ করে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী জেনারেল (অব.) আবদুল হাফিজের সম্পদের পরিমাণ তালিকার শীর্ষ পর্যায়ে রয়েছে।
নিচে প্রধান কয়েকজন উপদেষ্টার সম্পদের একটি তুলনামূলক তালিকা প্রদান করা হলো:
| উপদেষ্টার নাম | বর্তমান মোট সম্পদ (টাকা) | পূর্ববর্তী বছরের সম্পদ (টাকা) | উল্লেখযোগ্য তথ্য |
| শেখ বশিরউদ্দীন | ৯১.৬৫ কোটি (প্রায়) | ৯১.১১ কোটি (প্রায়) | পরিষদের শীর্ষ ধনী উপদেষ্টা |
| অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস | ১৫.৬২ কোটি | ১৪.০১ কোটি | সঞ্চয়পত্র ও আমানত বৃদ্ধি |
| ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ | ১৬.২২ কোটি | ১৫.০০ কোটি | মুনাফা ও চুক্তি থেকে আয় |
| সালেহউদ্দিন আহমেদ | ৭.১৬ কোটি | ৭.১০ কোটি | কোনো দায়দেনা নেই |
| শারমীন এস মুরশিদ | ১০.৯৩ কোটি | ১০.৬৫ কোটি | দায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে |
| আসিফ নজরুল | ১.৬০ কোটি | ১.৪৮ কোটি | স্ত্রী শীলা আহমেদের সম্পদ ২.৪৪ কোটি |
| সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান | ১.১২ কোটি | ২.২৫ কোটি | গত বছরের তুলনায় সম্পদ কমেছে |
সম্পদের সংজ্ঞা ও বিবরণীর ধরণ
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নতুন নীতিমালা ও আন্তর্জাতিক রীতিনীতি অনুসরণ করে এই বিবরণী তৈরি করা হয়েছে। এখানে সম্পদকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে:
১. আর্থিক সম্পদ: নগদ টাকা, ব্যাংক ব্যালেন্স, সঞ্চয়পত্র, শেয়ার এবং লভ্যাংশ।
২. নন-ফাইন্যান্সিয়াল সম্পদ: জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট এবং অন্যান্য স্থাবর সম্পত্তি।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সম্পদ কিছুটা কমলেও তাঁর স্ত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সম্পদ ১.৪০ কোটি থেকে বেড়ে ২.৯৯ কোটিতে উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে, ছাত্র প্রতিনিধি থেকে উপদেষ্টা হওয়া আসিফ মাহমুদের সম্পদের পরিমাণ ১৫.৩৪ লাখ টাকা এবং মো. মাহফুজ আলমের সম্পদ ১২.৭৬ লাখ টাকা বলে জানানো হয়েছে।
বিশেষ সহকারী ও বিদেশি সম্পদ
বিশেষ সহকারীদের মধ্যে জেনারেল (অব.) আবদুল হাফিজের সম্পদ ১৩ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। তবে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের সম্পদের চিত্র ভিন্ন; তাঁর দেশের বাইরে বিপুল পরিমাণ সম্পদ রয়েছে যার মূল্যমান প্রায় ৪৬ লাখ ৩৫ হাজার ইউএস ডলার। আলী রীয়াজ বিলম্বে যোগদান করায় এবং লুৎফে সিদ্দিকী সরকারি সুবিধা গ্রহণ না করায় তাঁদের সম্পদের তথ্য এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
এই স্বতঃস্ফূর্ত সম্পদ প্রকাশ বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি প্রশাসনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে।
