অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী

বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্যের অঙ্গনে উজ্জ্বল এক নাম — অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী।
তিনি ছিলেন একাধারে শিক্ষাবিদ, কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, সম্পাদক ও গণতান্ত্রিক চেতনার অকুণ্ঠ সাধক।

জন্ম ১৯২৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি, ঝিনাইদহ জেলার দুর্গাপুর গ্রামে।
পিতা মরহুম ফজলুর রহমান সিদ্দিকী, মাতা হালিমা খাতুন।

গ্রামের পাঠশালায় তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা। এরপর বাঁকুড়া জেলা স্কুলে পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়াশোনা করেন।
১৯৪১ সালে ভর্তি হন জলপাইগুড়ি জেলা স্কুলে, পরে যশোর জেলা স্কুলে অষ্টম থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন।
১৯৪৫ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় স্টার মার্কসহ প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে ভর্তি হন কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে।
১৯৪৭ সালে আইএ পরীক্ষায়ও অর্জন করেন প্রথম বিভাগ।

দেশভাগের পর চলে আসেন ঢাকায়, ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে বিএ অনার্সে এবং সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে আবাস গড়েন।
১৯৫০ সালে বিএ অনার্স পরীক্ষায় ইংরেজি সাহিত্যে একমাত্র প্রথম শ্রেণী অর্জন করেন,
পরের বছর এমএ পরীক্ষাতেও একই কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন।

১৯৫২ সালে সরকারি বৃত্তি নিয়ে পাড়ি জমান অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখানে তিনি অনার্স কোর্সে অধ্যয়ন করেন।
সেই বছরই সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য রেডিও পাকিস্তান, ঢাকা কেন্দ্রে প্রোগ্রাম সহকারী হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

অক্সফোর্ড থেকে দেশে ফিরে যোগ দেন ঢাকা কলেজে — সরাসরি প্রফেসর পদে, যা তাঁর শিক্ষাগত কৃতিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে প্রাপ্ত হয়।
১৯৫৫ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের লেকচারার হিসেবে যোগ দেন এবং ধীরে ধীরে রিডার ও বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৫৫ থেকে ১৯৭৩ পর্যন্ত তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক উজ্জ্বল অধ্যায় রচনা করেন।

১৯৭৪-৭৫ সালে তিনি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের খণ্ডকালীন পরিচালক,
এরপর ১৯৭৬ সালে যোগ দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে।
সফল প্রশাসক হিসেবে তিনি ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত দুটি মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন,
অবসর গ্রহণের পর আবারও ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে যুক্ত হন শিক্ষার্থীদের প্রিয় পরামর্শদাতা হয়ে।

১৯৮৪ সালের নভেম্বর থেকে ডিসেম্বর এবং ১৯৯৫ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি ছিলেন ভারতের শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং প্রফেসর।
২০০০ সালে তিনি গণবিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে যোগ দেন এবং ২০০৩ সালে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করেন।

জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী কেবল শিক্ষাবিদই নন — ছিলেন দক্ষিণ এশিয়ায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার এক নিবেদিত কর্মী।
বাংলা সাহিত্য, অনুবাদ, প্রবন্ধ ও সম্পাদনার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনন্য।
তাঁর বহু সাহিত্যকর্ম আজও পাঠকপ্রিয় ও মূল্যবান দলিল হিসেবে বিবেচিত।

বাংলার প্রজ্ঞাবান এই মানুষটি ২০১৪ সালের ১১ নভেম্বর পরলোকগমন করেন।
তবু তিনি বেঁচে আছেন তাঁর কর্মে, চিন্তায়, আর সাহিত্যের গভীরতম সৌন্দর্যে।

শ্রদ্ধাঞ্জলি।