সরকারের অন-গ্রিড সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যায়ক্রমে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ও উপযোগী স্থাপনায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা করতে নির্দেশ দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এর মাধ্যমে শিক্ষা খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের পক্ষ থেকে গত ২৩ সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠানো এক আদেশে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। এতে সরকারি দপ্তর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর চলমান উদ্যোগের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
আদেশে উল্লেখ করা হয়, সরকারি অফিসগুলোতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ বিভাগ অন-গ্রিড সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। সেই লক্ষ্যমাত্রার অংশ হিসেবে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব উপযোগী স্থানে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের উদ্যোগ নিতে হবে।
দুটি পদ্ধতিতে স্থাপনের সুযোগ
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের জন্য দুটি পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে। এর একটি হলো বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে ‘ওপেক্স’ বা OPEX মডেল। অন্যটি হচ্ছে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব অর্থায়নে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন।
নিজস্ব অর্থায়নের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় অর্থের ব্যবস্থা করে সৌর প্যানেল ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো স্থাপন করতে হবে। আর বেসরকারি বিনিয়োগভিত্তিক ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রাথমিক বিনিয়োগের চাপ তুলনামূলকভাবে ভিন্ন হতে পারে। কোন পদ্ধতি কার্যকর হবে, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো, অর্থায়নের সক্ষমতা ও স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন হবে।
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় ভবনের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন করে সূর্যের আলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। উৎপাদিত বিদ্যুৎ প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। অন-গ্রিড ব্যবস্থার ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ নেটওয়ার্কের সঙ্গে সমন্বয়ের সুযোগও থাকে। ফলে দিনের বেলায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ চাহিদার একটি অংশ এই উৎস থেকে পূরণের সুযোগ তৈরি হয়।
তবে সব ভবনের ছাদ একইভাবে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের উপযোগী নয়। ছাদের আয়তন, কাঠামোগত সক্ষমতা, সূর্যালোক পাওয়ার সুযোগ এবং বিদ্যুৎ সংযোগের বিষয়গুলো কারিগরিভাবে যাচাই করা প্রয়োজন হতে পারে। একই সঙ্গে প্যানেল স্থাপনের পর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারি স্থাপনায় সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের নির্দেশটি সরকারি স্থাপনাগুলোতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ। আদেশে বঙ্গভবন, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, পরিকল্পনা কমিশন ও অর্থ বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনায় সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এর ধারাবাহিকতায় অন্যান্য সরকারি দপ্তরের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও পর্যায়ক্রমে সৌরবিদ্যুতের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ শুধু কেন্দ্রীয় সরকারি কার্যালয় নয়, শিক্ষা খাতের অবকাঠামোকেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থার সম্প্রসারণের আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ক্রমাগত বাড়ার প্রেক্ষাপটে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস বহুমুখী করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। সৌরশক্তি এমন একটি উৎস, যা স্থানীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি করে। বিশেষ করে যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বড় ভবন বা পর্যাপ্ত ছাদ রয়েছে, সেখানে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বিদ্যুৎ ব্যবহারের একটি অংশ পূরণের সুযোগ থাকতে পারে।
শিক্ষার্থীদের জন্যও হতে পারে বাস্তব শিক্ষার সুযোগ
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের আরেকটি সম্ভাব্য দিক হলো শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্পর্কে জানার সুযোগ তৈরি হওয়া। বিজ্ঞান, পরিবেশ ও জ্বালানি বিষয়ে পাঠদানের সময় একটি চালু সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা বাস্তব উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
সৌর প্যানেল কীভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, উৎপাদিত বিদ্যুৎ কীভাবে ব্যবহার করা হয় এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গে এর সমন্বয় কীভাবে ঘটে—এসব বিষয়ে শিক্ষার্থীরা বাস্তব অবকাঠামো দেখে ধারণা নিতে পারবে। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহারের গুরুত্ব সম্পর্কেও সচেতনতা বাড়তে পারে।
তবে এ উদ্যোগের সফলতা শুধু প্যানেল স্থাপনের ওপর নির্ভর করবে না। প্রয়োজন হবে যথাযথ কারিগরি পরিকল্পনা, নিরাপদ বৈদ্যুতিক সংযোগ, মানসম্মত সরঞ্জাম, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত জনবল। দীর্ঘমেয়াদে ব্যবস্থা সচল রাখতে এসব বিষয়কে শুরু থেকেই পরিকল্পনার মধ্যে রাখতে হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার মূল উদ্দেশ্য হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের বৃহত্তর কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করা। পর্যায়ক্রমে এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শিক্ষা খাতের বিভিন্ন ভবনের ছাদ বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে সরকারের অন-গ্রিড সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়ানোর প্রচেষ্টাতেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ভূমিকা রাখতে পারবে।









