এশিয়ান গেমসে সোনার পদকের লক্ষ্যaনিয়ে জাপানে গিয়েছিল বাংলাদেশ পুরুষ ক্রিকেট দল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো পদক ছাড়াই ফিরতে হচ্ছে লিটন দাসের দলকে। সেমিফাইনালে পাকিস্তানের কাছে হারের পর ব্রোঞ্জপদকের লড়াইয়েও শ্রীলঙ্কার কাছে ৬৩ রানে হেরেছে বাংলাদেশ। ফলে এবারের এশিয়ান গেমসে ক্রিকেট থেকে কোনো পদকই পেল না দেশটি।
শনিবার নিশিনের কোরোগি স্পোর্টস পার্কে টস জিতে প্রথমে ব্যাট করে ২০ ওভারে ৯ উইকেটে ১৬৫ রান সংগ্রহ করে শ্রীলঙ্কা। জবাবে ১৭.৩ ওভারে ১০২ রানে অলআউট হয়ে যায় বাংলাদেশ। ৬৩ রানের জয়ে ব্রোঞ্জপদক নিশ্চিত করে শ্রীলঙ্কা।
ম্যাচের শুরুতে অবশ্য পরিস্থিতি ছিল পুরোপুরি বাংলাদেশের পক্ষে। শ্রীলঙ্কার টপ অর্ডারকে একের পর এক চাপে ফেলে মাত্র ২১ রানেই চার উইকেট তুলে নেয় বাংলাদেশ। মেহেদী হাসান দুটি উইকেট নেন। অভিষেক ম্যাচ খেলতে নামা আলিস আল ইসলামও উইকেটের দেখা পান। পরে সাইফ হাসানের বলে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট হারায় শ্রীলঙ্কা।
এত দ্রুত চার উইকেট হারানোর পর শ্রীলঙ্কার ইনিংস বড় সংগ্রহের দিকে যাবে, এমনটা তখন ভাবা কঠিন ছিল। কিন্তু সেখান থেকেই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন থারিন্দু রত্ননায়েকে। সাহান আরাচ্চিগের সঙ্গে জুটি গড়ে তিনি দলকে বিপর্যয় থেকে বের করে আনেন। আরাচ্চিগে করেন ৩৩ রান। এরপর শেষ দিকে বাংলাদেশের বোলারদের ওপর আক্রমণ বাড়িয়ে দেন রত্ননায়েকে।
মাত্র ৩২ বলে ৬৫ রানের ঝোড়ো ইনিংস খেলেন তিনি। তাঁর ব্যাট থেকে আসে সাতটি চার ও পাঁচটি ছক্কা। শ্রীলঙ্কার ইনিংসের শেষ ১০ ওভারে আসে ১১৪ রান। ২১ রানে চার উইকেট হারানোর পরও ১৬৫ রানে পৌঁছে যাওয়াটা মূলত তাদের লোয়ার অর্ডার ও শেষ দিকের ব্যাটিংয়ের সাফল্য।
বাংলাদেশের বোলিংয়েও শেষ দিকে নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি দেখা যায়। মুস্তাফিজুর রহমানের ১৪তম ওভারেই আসে ২৫ রান। তিন ওভারে ৪৩ রান দিয়ে দুটি উইকেট নেন তিনি। রিশাদ হোসেনও শেষ দিকে রান আটকাতে পারেননি। প্রথম দুই ওভারে ৯ রান দেওয়ার পর তাঁর শেষ দুই ওভারে শ্রীলঙ্কা তুলে নেয় ৩৭ রান। শুরুতে যে দলটি প্রতিপক্ষকে ২১ রানে চার উইকেটে চাপে ফেলেছিল, শেষ পর্যন্ত সেই দলই ১৬৫ রান হজম করে।
হারের পর বাংলাদেশের কোচ মোহাম্মদ সালাহউদ্দীন দলের পারফরম্যান্স নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বোলারদের নিয়ন্ত্রণ হারানো এবং ব্যাটিংয়ের শুরুতেই একাধিক উইকেট পড়ে যাওয়াই ম্যাচের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রেখেছে। দলের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারায় তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন।
পাওয়ারপ্লেতেই ম্যাচ থেকে ছিটকে যায় বাংলাদেশ
১৬৬ রানের লক্ষ্য টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে বড় হলেও অসম্ভব ছিল না। কিন্তু বাংলাদেশের রান তাড়া শুরু হতেই বিপর্যয় নামে। প্রথম ওভারে সাইফ হাসান শূন্য রানে ফেরেন। পরের ওভারে তানজিদ হাসানও কোনো রান না করেই সাজঘরে ফেরেন।
এরপর অধিনায়ক লিটন দাসও বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। নুয়ান থুশারার ইয়র্কারে প্রথম বলেই বোল্ড হয়ে যান তিনি। ফলে মাত্র ২.৩ ওভারে ৯ রানে তিন উইকেট হারায় বাংলাদেশ। পাওয়ারপ্লের শুরুতেই এমন ধাক্কার পর প্রয়োজনীয় রানরেটের চাপ আরও বাড়তে থাকে।
মাঝের ওভারে কয়েকজন ব্যাটার ব্যক্তিগতভাবে কিছু রান করলেও বড় কোনো জুটি গড়ে ওঠেনি। তাওহীদ হৃদয় করেন ৬ বলে ১১ রান। পারভেজ হোসেন ইমন ২৬ বলে ২০ এবং ইয়াসির আলী ১৬ বলে ২১ রান করেন। দলের পক্ষে সর্বোচ্চ ২৬ রান আসে নাসুম আহমেদের ব্যাট থেকে। তিনি ২৮ বল মোকাবিলা করেন।
কিন্তু ১০০ রান পার করলেও বাংলাদেশের ইনিংসে জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় গতি দেখা যায়নি। নিয়মিত বিরতিতে উইকেট পড়ায় শেষ পর্যন্ত ১৭.৩ ওভারেই অলআউট হয়ে যায় দল।
শ্রীলঙ্কার বোলারদের মধ্যে নুয়ান থুশারা, থারিন্দু রত্ননায়েকে, বিজয়কান্ত ভিয়াসকান্ত ও ওয়ানুজা সাহান দুটি করে উইকেট নেন। ব্যাট হাতে দলের বিপর্যয় সামলানোর পর বল হাতেও রত্ননায়েকে সফল ছিলেন। ১৮ রান দিয়ে তিনি নেন দুটি উইকেট।
কোচের হতাশা, অধিনায়কের পাশে থাকার বার্তা
ব্রোঞ্জের ম্যাচে হারের পর সালাহউদ্দীন নিজেদের ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে দলের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। এশিয়ান গেমসে ভালো ফল করার যে লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ জাপানে এসেছিল, সেটি পূরণ হয়নি—এমন হতাশাই উঠে এসেছে তাঁর কথায়।
অধিনায়ক লিটন দাসও দলের সামগ্রিক পারফরম্যান্স নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। তবে তিনি সতীর্থদের পাশে থাকার কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ক্রিকেটাররা দেশের হয়ে লড়াই করেছেন; এখন এই ব্যর্থতা থেকে বেরিয়ে আসার উপায় খুঁজে বের করাই দলের সামনে বড় কাজ।
এবারের এশিয়ান গেমস অভিযান শুরু হয়েছিল বড় প্রত্যাশা নিয়ে। এর আগে এ প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের পুরুষ ক্রিকেট দল তিনবার অংশ নিয়ে প্রতিবারই পদক জিতেছিল। ২০১০ সালে প্রথম অংশগ্রহণেই স্বর্ণপদক জয়ের পর থেকেই এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের ক্রিকেটে একটি ধারাবাহিক সাফল্যের ইতিহাস তৈরি হয়েছিল।
এবার সেই ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়ল। বৃষ্টির কারণে পুরুষ ক্রিকেটের কোয়ার্টার-ফাইনালের দুটি ম্যাচ পরিত্যক্ত হওয়ায় র্যাঙ্কিংয়ের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা সেমিফাইনালে জায়গা পায়। এরপর বাংলাদেশ পাকিস্তানের কাছে হেরে স্বর্ণের লড়াই থেকে ছিটকে যায়। শেষ সুযোগ ছিল ব্রোঞ্জপদক। সেই ম্যাচেও ২১ রানে চার উইকেট তুলে নিয়ে ভালো অবস্থানে থেকেও শ্রীলঙ্কাকে থামাতে পারেনি বাংলাদেশ।
শেষ পর্যন্ত শ্রীলঙ্কার ১৬৫ রানের জবাবে ১০২ রানে থেমে যায় বাংলাদেশের ইনিংস। ৬৩ রানের হার নিয়ে পদকশূন্য হাতেই শেষ হয় বাংলাদেশের এশিয়ান গেমস ক্রিকেট অভিযান। শুরুতে স্বর্ণের স্বপ্ন, এরপর ফাইনালের আশা এবং সবশেষে ব্রোঞ্জের লড়াই—তিন ধাপ পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত কোনো পদকই জুটল না লিটন দাসের দলের।









